প্রখ্যাত অমেরিকান কবি জে আর লাওয়েল বলেছিলেন-‘আমি একটি স্বাধীন দেশের নাগরিক, এর চাইতে বড় গৌরব আর কিসে হতে পারে?’ কিন্তু যাদের ভাগ্যে এই গৌরবটুকু জোটেনি তেমনি এক হতভাগ্য জুলিও ওশিতা। যিনি এই গৌরবময় সৌভাগ্য প্রাপ্তির আশায় পার করেছেন জীবনের ৯০ টি বছর। ফিলিপাইনে অবস্থানরত জাপানি বংশোদ্ভূত ওশিতা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের তান্ডবে রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়েন।
সেই থেকে জীবনের এতগুলো দিন পার করেছেন রাষ্ট্রপরিচয়হীন মানুষ হিসেবে। দীর্ঘদিন তিনি জাপানি নাগরিকত্ব অর্জনের চেষ্টায় থাকলেও এখনও পাননি।
জাতিসংঘ শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশন, ফিলিপাইন অফিসের তথ্যমতে, যেসকল জাপানি বংশোদ্ভূত নাগরিক যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে ফিলিপাইনে অবস্থান করছে তাদের গড় বয়স ৮১ বছর। ইতোমধ্যে এরকম ৭০০ এরও বেশি রাষ্ট্রহীন জাপানি, জাপানের নাগরিকত্ব অর্জন না করেই মারা গেছেন। সম্প্রতি তারা রাষ্ট্রহীন মানুষের সমস্যা দূরীকরণের জন্য জাপান এবং ফিলিপাইনকে জরুরিভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন।
বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে ফিলিপাইন ছিল দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার সবচেয়ে বড় জাপানি অভিবাসীদের বসবাস এর স্থান। বেশিরভাগ জাপানি বংশোদ্ভূতরাই ওই সময়টাতে জাপান ছেড়ে ফিলিপাইনে এসেছিল আশ্রয়ের জন্য।

কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার সাথে সাথে অসংখ্য জাপানিরা তাদের পরিবারের কাছ থেকে পৃথক হয়ে যায়। তাদের মধ্যে অনেকে জাপানি সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিল। যাদের অনেকেই পরবর্তী সময়ে জাপানে প্রত্যাবর্তিত হয়েছিল, আবার অনেকে যুদ্ধে মারা গিয়েছিল।
ইউএনএইচসিআরের একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘যেহেতু তারা যুদ্ধের সময় জাপানি অত্যাচারের প্রতিশোধের টার্গেটে পরিণত হয়েছিল, তাই অনেক জাপানি বংশধর ফিলিপাইনের প্রত্যন্ত স্থানে পালিয়ে যায় এবং সেসব নথি নষ্ট করে ফেলে যেগুলো প্রমাণ করে যে তারা জাপানি।’ আর এজন্যই এই মানুষগুলো কখনো তাদের নাগরিকত্ব অর্জন করতে পারেনি।
কৃষিক্ষেত্রে যুক্ত থাকার জন্য ওশিতার বাবা ১৯১১ সালে নাগাসাকি প্রদেশ থেকে ফিলিপাইনে ভ্রমণ করতে এসেছিলেন এবং পরে স্থানীয় এক নারীকে বিয়ে করেছিলেন। তবে যুদ্ধ শুরু হওয়ার সাথে সাথে জাপানবিরোধী মনোভাব বৃদ্ধি পেয়েছিল এবং ১৯৪২ সালে স্থানীয় গেরিলা বাহিনী ওশিতার বাবাকে গুলি করে হত্যা করে।
১৯৬০ সালে ওশিতা ও তার ভাই বাবার স্বজনদের খুঁজে পেতে জাপানের দূতাবাসে একটি চিঠি পাঠিয়ে সাহায্য চেয়েছিলেন, কিন্তু তাতে কোনো কাজ হয়নি।
২০১৮ সালে ওশিতোর পরিচিত একজন ফিলিপাইনে অবস্থানরত জাপানি বংশোদ্ভূত রাষ্ট্রহীন মানুষদের সমর্থন গোষ্ঠীর সাথে তাকে যোগাযোগ করিয়ে দেয়। পরের বছর জাপানি দূতাবাসের একজন কর্মী এবং জাপানি আইনজীবীরা তার সাক্ষাৎকার নিয়ে তথ্য সংগ্রহ করেন।
পরবর্তীতে তদন্ত করে জানা যায়, তার বাবার স্থায়ী বাসস্থান ছিলো জাপানের হিরোশিমা প্রদেশে। জুলিও ওশিতা হিরোশিমার একটি পারিবারিক আদালতে তার জাপানি নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করেছিলেন। যার ফলস্বরূপ, গত ২৮ এপ্রিল জাপানের সরকারি দফতর তাকে জাপানে নতুন একটি পরিবার নিবন্ধনের অনুমতি দিয়েছে। এটিকে নাগরিকত্ব পাওয়ার একটি আশানুরূপ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন তিনি।
ওশিতার মত আরও অনেকেই অপেক্ষায় আছেন নাগরিকত্বের আশায়। তারা বলেন, ‘আমাদের শরীরে জাপানি রক্ত বয়ে যাচ্ছে। আমরা আমাদের দেশে ফিরে যেতে চাই।’