প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র বিশাল সৈন্যবাহিনী নিয়ে লড়াই করেছিল। শক্তিশালী সেই বাহিনীতে সারা পৃথিবী থেকে আগত অসংখ্য অভিবাসী যোগ দিয়েছিল। মার্কিন সেনাদের প্রায় চল্লিশ শতাংশ ছিল অভিবাসী বা অভিবাসীদের সন্তান। তাদের সেবা আমেরিকাকে কেবল যুদ্ধে জয়ী হতে সাহায্যই করেনি বরং নতুন আমেরিকানদের একটি সম্পূর্ণ প্রজন্মের আত্মীকরণকেও ত্বরান্বিত করেছে।
১৯১৭ সালে যুক্তরাষ্ট্র এমন এক সময় যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিল, যখন কিনা দেশটিতে রেকর্ডসংখ্যক অভিবাসনপ্রত্যাশী প্রবেশ করেছিল। ১৯০১-১৯২০ সাল পর্যন্ত প্রায় ১ কোটি ৪৫ লাখ অভিবাসী যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেছিল। অন্যান্য বহ দেশ যখন অভিবাসনের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছিল তখন মার্কিনিরা নতুন এই অভিবাসীদের স্বাগত জানিয়েছিল।

১৯১০ সালের মধ্যে, আমেরিকার জনসংখ্যার প্রায় ১৫ শতাংশ বিদেশী বংশোদ্ভূত ছিল। যদিও এর আগে আমেরিকায় আগতদের বেশিরভাগই ব্রিটিশ, আইরিশ বা জার্মান ছিল। যুদ্ধের সময়ে আগত ওই সাম্প্রতিক অভিবাসীদের অধিকাংশই পূর্ব, মধ্য এবং দক্ষিণ ইউরোপ থেকে এসেছিল। এশিয়ার দেশগুলো থেকে অল্প সংখ্যক অভিবাসী এসেছিল। আমেরিকান সমাজে অপরিচিত ভাষা ও সংস্কৃতি প্রবর্তনের সেই সময়কালে তাদের এই আগমন মার্কিন জনসংখ্যাকেও বৃদ্ধি করেছিল।
১৯১৪ সালের জুলাই মাসে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রাদুর্ভাবের ফলে অভিবাসী জনগণ যুদ্ধে কেমন প্রতিক্রিয়া দেখাবে তা নিয়ে আমেরিকানরা উদ্বিগ্ন ছিল, যেহেতু সেই সময়ে আগত অভিবাসীদের যুদ্ধে জড়িত দেশগুলির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক ছিল। অনেক স্থানীয় বংশোদ্ভূত আমেরিকানরা অভিবাসীদের বিরুদ্ধে নানা কুসংস্কারে ভুগছিল, তাদেরকে অলস এবং কাপুরুষ হিসেবে মনে করত। কেউ কেউ আবার তাদের কার্যকর সৈনিক হতে প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে কিনা সে বিষয়ে প্রস্তাবও দিয়েছিল।
আগ্রহী অভিবাসীদের সৈনিক হিসেবে প্রশিক্ষণ দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়। তবে প্রথম দিকে যখন বিদেশি বংশোদ্ভূত রিক্রুট এবং ড্রাফটরা সামরিক প্রশিক্ষণ শুরু করেন, তখন অনেকেই সেনাবাহিনীর সাধারণ আদেশগুলি বুঝতে পারছিলেন না। ভাষা জটিলতা, কয়েক বছর ধরে অপুষ্টিজনিত দুর্বলতা এবং কঠোর পরিশ্রমের কারণে তাদের শারীরিকভাবে শক্তি ধরে রাখতে সমস্যা হচ্ছিল। ভুল বোঝাবুঝি এবং কুসংস্কার তর্কে সাংঘর্ষিক পরিস্থিতিও তৈরি হয়েছিল।

সেনাবাহিনী দ্রুতই এই সমস্যাগুলি মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়। বহুভাষী কর্মকর্তাদের নেতৃত্বে বিদেশী ভাষা নিয়োগকারীদের দ্বারা প্রশিক্ষণ ইউনিট সংগঠিত করা হয়েছিল। এছাড়াও অভিবাসীদের প্রথাগত ঐতিহ্য উদযাপন এবং ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান পালনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা এবং খাবারের সময় যার যার দেশীয় খাবার পরিবেশন করা হত। একই সময়ে, অভিবাসীরা ইংরেজী ভাষা, আমেরিকান ইতিহাস এবং নাগরিক শাস্ত্রে নিবিড়ভাবে প্রশিক্ষণ পেয়েছিল।
এই ব্যবস্থাগুলি বিদেশী বংশোদ্ভূত সৈনিকদের মনোবল এবং কর্মক্ষমতার উন্নয়ন ঘটিয়েছিল। তাদের ইউনিট বিদেশে পাঠানোর সময়, অভিবাসী সৈন্যরা তাদের সহযোদ্ধাদের এবং স্থানীয় আমেরিকান সৈন্যদের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক গড়ে তুলতে শুরু করেছিলেন।
নন-সিটিজেন সৈন্যদের আরো বেশি সংযুক্ত করতে কংগ্রেস সামরিক বাহিনীতে থাকা বিদেশি বংশোদ্ভূত সদস্যদের দ্রুত নাগরিকত্ব দেয়ার অনুমতি দেয়ার আইন পাস করে যুক্তরাষ্ট্র। এই সুযোগটি তিন লাখেরও বেশি অভিবাসী সৈনিককে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক হওয়ার পথে বিশেষ ভূমিকা রাখে।
আর এই বিষয়গুলোই প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়কালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে অভিবাসীদের অস্ত্র হাতে তুলে নেয়ার ক্ষেত্রে বড় ধরনের ভূমিকা রাখে বলে মনে করা হয়। অনেক অভিবাসী সেনাবাহিনীতে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করেছেন। যা প্রমাণ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি তাদের আনুগত্য ও দেশপ্রেমের অনুরাগ।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে নানাভাবে দেশে কিংবা বিদেশে অবস্থানরত অবস্থায় অভিবাসীরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সৈন্যবাহিনীতে অবদান রেখেছে। অনেক অভিবাসী তাদের প্রথম বিশ্বযুদ্ধে সম্পৃক্ত থাকাকে নিজের জীবনের একটি রূপান্তরকারী ঘটনা হিসেবে দেখেছিলেন। এমনকি নতুন আমেরিকান হিসেবে তাদের পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে ধরে নিয়েছিল।
যুদ্ধের ময়দানে, অভিবাসী এবং স্থানীয় বংশোদ্ভূত সৈন্যরা একে অপরের সঙ্গে পরিশ্রম করেছে, যুদ্ধ করেছে, রক্তাত্ত হয়েছে। অভিবাসীদের প্রতি কুসংস্কারাচ্ছন্ন মনোভাব এবং স্টেরিওটাইপ চিন্তা ভাবনাকে ছুড়ে ফেলে একজন মানুষ একজন ভাল সৈনিক কিনা তা গুরত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। সকল জাতির সৈন্যদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নেওয়া কষ্ট এবং ত্যাগ এক গভীর মেলবন্ধন তৈরি করেছিল। তাদের মধ্যে তারকা খচিত আমেরিকান পতাকার জন্য লড়াই করে যাওয়ার গর্ববোধ আরো শক্তিশালী হয়ে উঠছিল ।
বিদেশী বংশোদ্ভূত সৈন্যদের পরিবার যুদ্ধে নিজেদেরকে গভীরভাবে সমর্পিত করেছিল। তারা যুদ্ধের বন্ড কিনেছিল এবং গর্বের সাথে তাদের জানালার সামনে ‘ব্লু স্টার সার্ভিস পতাকা’ (অমেরিকান পরিবারের কোনো সদস্য দেশের হয়ে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে, এমন পরিচিতি স্বরূপ তার পরিবার বাড়িতে এই পতাকা প্রদর্শন করে থাকে ) টানিয়ে রাখত।
সৈন্যদের অনেকে যুদ্ধ শেষে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে এসে নাগরিকত্ব গ্রহণের সুযোগ পেয়েছিল। বিপরীত দিকে অনেকেই নাগরিকত্ব পাওয়ার আগে মার্কিনিদের পক্ষে সেবা দিতে গিয়ে যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৩ জন অভিবাসী সম্মানসূচক মেডেল অর্জন করেন।
এদের মধ্যে- স্লোভাকিয়া থেকে আগত অভিবাসী মাতেজ কোকাক নামের একজন সৈনিককে বিশেষভাবে স্মরণ করে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী। কারণ তিনি ১৯১৮ সালের ১৮ জুলাইয়ে সংগঠিত তীব্র যুদ্ধের সময় সেনা ও বিমান উভয় বাহিনীতেই নায়োকোচিত অবদান রেখছিলেন। এই যুদ্ধে তিনি জয়ী হলেও একই বছরের অক্টোবরের ৪ তারিখ জীবনযুদ্ধে পরাজিত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। কোকাককে ফ্রান্সে সমাহিত করা হয়। তার সমাধি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় লাখো দেশপ্রেমিক অভিবাসীর আত্মত্যাগকে স্মরণ করিয়ে দেয়।
তথ্যসূত্র: দ্য ইউএস ওয়ার্ল্ড ওয়ার ওয়ান সেন্টেনিয়াল কমিশন এবং ইউএস সিটিজেনশীপ এন্ড ইমিগ্রেশন সার্ভিসেস