অভিবাসনে মধ্যসত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য ও নিয়ন্ত্রণের কথকতা

0
1231

আমিনুল হক তুষার

সাধারণত একজন অভিবাসন প্রত্যাশী শ্রমিককে অভিবাসনের সূচনালগ্ন থেকেই মধ্যসত্বভোগী বা দালালের  খপ্পরে পড়তে হয়। প্রকৃতপক্ষে, অভিবাসন প্রত্যাশী শ্রমিক বা কর্মীরা সরকারি সংস্থা বা রিত্রুটিং এজেন্সির কাছে সরাসরি যায় না বা যোগাযোগ করেন না বললেই চলে। সিদ্ধান্তগ্রহণ বা প্রাথমিক যাচাই বাছাইয়ের জন্য তারা প্রান্তিক পর্যায়ে সক্রিয় এই সকল মধ্যসত্বভোগী বা দালালের তথ্যের উপরেই নির্ভর করে এবং বিশ্বাস করে ।আর এই প্রক্রিয়াটি যুগ যুগ ধরে চলে আসছে।

শুধুমাত্র বিদেশে কর্মী পাঠানোর জন্য রিত্রুটিং এজেন্টদের গ্রাম্য দালালরাই এক্ষেত্রে দৃশ্যমান হলেও পাসপোর্ট তৈরী থেকে শুরু করে, ভিসা, ফিঙ্গারিং, ট্রেনিং, এমনকি বিদেশে বৈধ কাগজপত্র তৈরী (ইকামা, ভিসার মেয়াদ বৃদ্ধি, পাসপোর্টের নবায়ন ইত্যাদি) করতেও দেশি বিদেশী বিভিন্ন দালালের শরণাপন্ন হতে হয় তাদের ।

যদিও এই সকল মধ্যসত্বভোগী বা দালালদের কারণেই প্রান্তিক পর্যায়ের জনসাধারণ বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ পাচ্ছে। কিন্তু অসচেতনতা, স্বল্পশিক্ষা, ও যথাযথ প্রশিক্ষণের অভাবের কারণে অভিবাসন প্রত্যাশীদের বিভিন্ন ধরণের দুষ্ট দালালদের প্রতারণার শিকার হতে হয়। যার প্রভাবে একদিকে যেমন অভিবাসন ব্যয় বেড়ে যায়, অন্যদিকে অবৈধ পথে অভিবাসনের জন্য তাদেরকে মানবপাচারের শিকার হয়ে নির্যাতিত হতে হয়।

বিভিন্ন গবেষণা ও অভিবাসী সংস্থার অভিজ্ঞতা থেকে ধারণা পাওয়া যায়- শুধুমাত্র রিত্রুটিং এজেন্টদের দালাল বা মধ্যসত্বভোগীরা নয়, পুরো অভিবাসন প্রক্রিয়ার বিভিন্ন স্তরে রয়েছে হরেক রকমের মধ্যসত্বভোগী বা দালাল। যেহেতু প্রান্তিক পর্যায়ে রিত্রুটিং এজেন্টদের শাখা নেই বা স্বীকৃত সাব-এজেন্ট নেই, তাই ওই সকল ব্যক্তি যারা অভিবাসী বা অভিবাসন প্রত্যাশী শ্রমিকদের পরিচিত ও যাদের প্রান্তিক পর্যায়ে ও গন্তব্য দেশে অভিগম্যতা রয়েছে – তারাই মধ্যসত্বভোগী বা দালাল হিসেবে কাজ করে।

এদের কারো কারো বিদেশে লোক পাঠানো বা কর্মসংস্থান করানোর সাফল্য সাধারণ মানুষদের উৎসাহিত করে এবং তারা বিশ্বাসভাজনও হয়ে ওঠে । ফলে, অভিবাসন প্রত্যাশী কর্মীদের ও তাদের পরিবারের বিদেশ গমনের যেকোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের প্রভাব অনেক বেশিই থাকে।

দেখা গিয়েছে বিভিন্ন ট্রাভেল বা টিকেটিং এজেন্সিরাও বিদেশে লোক পাঠানোর জন্য কাজ করে থাকে, যদিও তাদের অনেকেই বিএমইটির নিবন্ধিত নয়। কিন্তু অভিবাসন প্রত্যাশী ব্যক্তির অজ্ঞতা ও সচেতনতার অভাবের কারণে তারাও সুযোগ পায় দালাল বা ব্রোকারের ভূমিকা পালনের।

 অনেক সময় দেখা যায়, পাসপোর্ট তৈরির জন্য জন্মনিবন্ধন কিংবা অভিবাসীর কল্যাণের সেবা নেয়ার জন্য কর্মী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের ইউনিয়ন পরিষদে, পৌরসভা কিংবা সিটি কর্পোরেশনে যেতে হয়। স্বল্পশিক্ষিত ও সচেতনতার অভাবে এই সেবা কেন্দ্রগুলো হতে সেবা প্রাপ্তির জন্য ও অনেক সময় শরণাপন্ন হতে হয় কিছু মধ্যসত্বভোগীদের । এর সঙ্গে পাসপোর্ট অফিসের দালাল তো আছেই, যারা আশ্বাস দেন কম সময়ে নির্ভুলভাবে সশরীরে দর্শন ছাড়া পুলিশ ক্লিয়ারেন্সসহ পাসপোর্ট তৈরী করার।

সত্যিকার অর্থে, অনেক অভিবাসন প্রত্যাশী শ্রমিক বা ব্যক্তিরা এখনো জানেন না যে বিদেশ গমনের পূর্বে ও ম্যানপাওয়ার ক্লিয়ারেন্স প্রাপ্তির পূর্বশর্ত হচ্ছে প্রাক-বহির্গমন প্রশিক্ষণ সমাপ্তির সনদ বা সার্টিফিকেট গ্রহণ। স্বাভাবিক অভিবাসন প্রক্রিয়া চিন্তা করে অনেক সময় অভিবাসন প্রত্যাশীরা এই প্রশিক্ষণকে গুরুত্ব দিতে চান না এবং নির্ভর করেন এক শ্রেণীর দালালদের উপর। যারা রিত্রুটিং এজেন্সির পক্ষে বা এককভাবে টিটিসি হতে প্রশিক্ষণ সনদ দ্রুত সময়ে সংগ্রহ কিংবা দূর হতে আগত প্রশিক্ষণার্থীদের জন্য আবাসনের ব্যবস্থা করে তাদের বিশ্বাসভাজন হন।

মূলত: এই শ্রেণীর দালালদের উদ্ভবের কারণ হিসেবে বলা যায়, টিটিসিগুলোতে পর্যাপ্ত আবাসন ব্যবস্থার সংকট ও প্রান্তিক পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি কার্যক্রমের অভাব। এছাড়া কম সময়ে ম্যানপাওয়ার ক্লিয়ারেন্স বা স্মার্ট কার্ড সংগ্রহ করার প্রয়োজনীয়তা থেকে। এমনকি এয়ারপোর্ট এ ইমিগ্রেশন পার করিয়ে দেয়ার জন্য রিত্রুটিং এজেন্সীর লোক ছাড়াও আর এক ধরণের দালাল বা মধ্যসত্বভোগী সক্রিয় রয়েছে।

এতো গেলো দেশের ভিতরের দালাল বা মধ্যসত্বভোগীদের কথা। কর্মীদের গন্তব্য দেশে পৌছানোর পর হতে পুরো অভিবাসন প্রক্রিয়াতেই দালাল বা বিভিন্ন স্তরের মধ্যসত্বভোগীদের দ্বারস্থ হতে হয় বা নির্ভরশীল থাকতে হয়। যেমন: পৌছানোর পরে গন্তব্য দেশের এয়ারপোর্ট হতে গ্রহণ করে কর্মক্ষেত্রে পৌছানো বা স্থানীয় এজেন্সির নিকট হস্তান্তর, ওয়ার্ক পার্মিট বা ইকামা প্রাপ্তি, চাকুরী বা মালিক পরিবর্তন, ভিসা ও পাসপোর্ট নবায়ন, এমনকি অবৈধভাবে বর্ডার পার হওয়া বা অনুপ্রবেশের জন্যও নির্দিষ্ট দালাল বা এজেন্ট থাকে-  অভিবাসী কর্মীদের যাদের কাছে নিরুপায় হয়ে  যেতে হয়।

যার ফলস্বরূপ তাদেরকে দিতে হয় চড়া আর্থিক মূল্য। ভাগ্য খারাপ হলে অনেক অভিবাসন প্রত্যাশী বা অভিবাসী কর্মীরা মানবপাচারকারীদের খপ্পরে পড়ে হয়ে যান নিঃস্ব, সর্বশান্ত । শেষ পর্যন্ত তাদের সহায় সম্বলহীনভাবে দেশে ফিরতে হয়।

আসলে অজ্ঞতা ও পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাবের কারণের  বিভিন্ন দালাল বা মধ্যসত্বভোগীদের দ্বারস্থ হতে হয় অভিবাসী কর্মীদের। এর সাথে অবশ্য রয়েছে আইনের শাসনের  অভাব। আজ অবধি আমরা রিত্রুটিং এজেন্ট ও তাদের সাব-এজেন্টদের পূর্ণাঙ্গরূপে জবাবদিহিতার আওতায়  আনতে পারিনি। যার কারণে বিভিন্ন স্তরের দালাল বা মধ্যসত্বভোগীদের সেবা নিতে গিয়ে সরকার নির্ধারিত অভিবাসনের ব্যায়ের চেয়ে পাঁচ থেকে সাত গুন বা তারও বেশি অর্থ খরচ করতে হচ্ছে। শুধু তাই নয়, সরকারের কার্যকর অভিবাসন ব্যবস্থাপনার পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি না থাকায় অভিবাসনের আড়ালে মানব পাচার ও হচ্ছে।  

বিগত ১০ ফেব্রুয়ারী ২০২১ এ প্রচারিত বাংলাভিশনের একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বিদেশে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে দালালদের নিবন্ধনে রিত্রুটিং এজেন্সির অনাগ্রহ রয়েছে – যা প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী নিজে স্বীকার করেছেন। তিনি আরো বলেছেন , দালালদের নিবন্ধনে মন্ত্রণালয় রিত্রুটিং এজেন্সির সহযোগিতা  পূর্ণাঙ্গভাবে পাচ্ছে না।  প্রায় চার মাস যাবৎ নির্দেশনা দেয়া থাকলেও, তা কার্যকর হচ্ছে না বা রিত্রুটিং এজেন্টরা সাড়া দিচ্ছে না। (https://www.facebook.com/banglavision/posts/4145275828862012)

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশি কর্মসংস্থান নীতি ২০১৬ এর ১.৮.৩. ও ২.২.১২. নং অনুচ্ছেদে বলা আছে, তৃণমূল পর্যায়ে অভিবাসী কর্মীদের কল্যাণমূলক কার্যক্রম সম্প্রসারণের মাধ্যমে অনিয়মিত অভিবাসন ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যের নিয়ন্ত্রণ কমাতে হবে। আবার মন্ত্রণালয়ের নীতিমালা বাস্তবায়নের কর্মপরিকল্পনার ৫১ পৃষ্ঠাতে (২৪ নম্বরে) ও নির্দেশনা দেয়া আছে মধ্যসত্বভোগীদের বাদ দিয়ে ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে অভিবাসনের তথ্য প্রচার করার। কিন্তু এই সকল পরিকল্পনা কাগজে কলমেই রয়ে গেছে। যার ফলে অভিবাসন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি ভোগান্তিও বাড়ে অভিবাসন প্রত্যাশী কর্মীদের।

তাই নিরাপদ অভিবাসন ও সহনশীল ব্যয় নিশ্চিতে দালাল ও স্বীকৃত বা নিবন্ধিত নয় এই সকল মধ্যসত্বভোগীদের নিয়ন্ত্রণ করা খুবই জরুরি। পাশাপাশি অভিবাসন প্রত্যাশীদের এই ব্যাপারে সচেতন ও শিক্ষিত করতে প্রান্তিক পর্যায়ে অভিবাসী সংগঠন ও উন্নয়ন সংস্থাদের সম্পৃক্ত করে বিস্তৃত কার্যক্রম হাতে নেয়া উচিত। দালাল বা মধ্যসত্বভোগীদের উপর নির্ভরশীলতা কমানো ও সরকারি সংস্থাগুলোর সেবার মান উন্নত করলে অভিবাসন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। আর এভাবেই আমরা অভিবাসনকে একটি লাভজনক পেশা বা খাত হিসেবে তুলে ধরে বৈধ পথে রেমিট্যান্স আনয়নের মাধ্যমে সমৃদ্ধ করতে পারবো দেশকে।

লেখক: শ্রম অভিবাসন বিশ্লেষক ও উন্নয়নকর্মী

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here