উদ্বাস্তু হাওয়ার হাহাকার-দ্বিতীয় পর্ব

0
1132

রোমেল রহমান

শেষ আশ্বাস

শুনেছ খবর?

-কি?

সারা দুনিয়া আমাদের জন্য ফুঁসে উঠছে।

-বাহ! কোথায় শুনলে?

এক সিপাহী আরেক সিপাহীর সঙ্গে আলাপ করছিলো! কে যেন আড়াল থেকে শুনেছে ওদের কথা।

-তাহলে ঘটনা সত্য। ওরা কি ভয় পাচ্ছে?

জানি না।  তবে আর কটা দিন পাড়ি দিতে পারলে হয়তো একটা ঘটনা ঘটবে।

-কেমন ঘটনা?

জানি না। হয়তো…নাগরিকত্ব ফিরে পাবো? ঘর ফিরে পাবো? কিন্তু ঘরের সব মানুষগুলো তো নেই!

-অন্তত আমরা বেঁচে যাবো!

মহল্লার সব মানুষ গুলো আগের জীবনে ফিরতে পারবে?

-না। 

যাইহোক আমরা তো আছি কি বল?

-হুম।

অন্য কোথাও পাঠিয়ে দেবে হয়তো আমাদের।

-কে বলেছে, ঐ সৈনিকেরা?

না।  আমার মনে হচ্ছে।

-জন্মালেই জন্মভূমি নিজের হয় না তাই না?

এখন তো তাই দেখছি!

-বইপুস্তক ভুল শিখিয়েছিল আমাদের!

হ্যাঁ।

-বই লেখে কারা?

যাদের দেশ আছে তারা হয়তো!

– হা হা! আমাদের একজন লেখক থাকলে মজা হতো তাই না?

কি লিখত সে?

-আমাদের জ্যান্ত মৃত্যুর গল্প।

তোমার কি মনে হয় কোনদিন কি আমরা আবার দেশ পাবো?

-কোনদিন কি ভেবেছিলে তুমি দেশহারা হবে?

ধুর!

-আমি একটা বোমা বানাবো।

কেন?

-নিজেকে উড়িয়ে দিতে।

কচ্ছপ

দুটো অতিকায় কচ্ছপ পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে পালাতে থাকে…

আমরা যাচ্ছি কোথায়?

-সমুদ্রের দিকে!

এখানে কিন্তু ভালোই ছিলাম কি বল?

-হ্যাঁ! খারাপ না! সমুদ্র না হোক অন্তত পুকুরটায় আয়েশ ছিল!

অযথাই পুকুরের জলে বিষ দিতে গেলো! আমার এখনো মাথা ঘুরাচ্ছে! ভাগ্যিস তুমি টের পেয়েছিলে যে, জলে বিষ দিয়েছে; নৈলে এতক্ষণ অন্যদের মতো মরে ভ্যাব্দা হয়ে থাকতাম! কিন্তু পুকুরের জলে বিষ দিতে গেলো কোন দুঃখে?

-ঐ পুকুরের জল এলাকার লোকেরা খেয়ে থাকে! তাই হয়তো বিষ দিয়েছে!

ইসস! কি ভয়ঙ্কর! আচ্ছা, আমাদের ভাগ্যে এখন কি আছে?

-জানি না!

উঁহু! তুমি অনেক কিছু জানো! আমার থেকে কমপক্ষে পঞ্চাশ বছরের বড় তুমি! অনেক কিছুই দেখেছো! বল না!

-মধ্যখান দিয়ে নিজের কচি বয়সটা জাহির করবার দরকার নেই! হাঁটো!

আহা! বল না!

-ঘ্যানঘ্যান করো না তো!

আমি যাবো না!

-না গেলে মরবে! কাউকে পাবে না! আমি কিন্তু থেমে থাকতে রাজি নই!

বল না আমাদের কি হবে!

-অনেক কিছুই হতে পারে! এই যেমন আমরা তো যাচ্ছি, যাবার পথে সৈনিকদের সামনে পড়লে ওরা আমাদের মতো বড় দুটো জ্যান্ত কচ্ছপ দেখে লুফে নিতে পারে! তারপর ধর আমাদের কেটেকুটে রান্না করে খেয়ে ফেলতে পারে! আবার উদ্বাস্তু যারা পালিয়ে বেড়াচ্ছে! তাদের ভীষণ খাদ্য সংকট যাচ্ছে! তাদের সামনে পড়লে তারাও আমাদের ধরে রান্না করে খেয়ে ফেলতে পারে!

উফফফ! বল কি! তাহলে আমাদের তো মহাবিপদ!

-তার চেয়ে বাজে ব্যাপার হতে পারে! কেউ যদি রৌদ্রের মধ্যে আমাদের উল্টে ফেলে রাখে! জ্যান্ত মারা যাওয়াটা সব থেকে কষ্টের হবে!

আচ্ছা তুমি তো গত দেড় শ বছর এখানে থাকলে, আগে কখনো এমন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়েছে?

-এই যে একশ একান্ন বছরে এসে হল! চল দ্রুত! পা চালাও! কথা বাড়িয়ো না!

আমরা কি সত্যিই সমুদ্রের দিকে যাচ্ছি?

-হ্যাঁ! সমুদ্রই আমাদের মোক্ষ!

সমুদ্র যেন কোনদিকে?

-হবে কোন এক দিকে, আগে বাঁচো; কোথাও না কোথাও তো সমুদ্র থাকবে!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here