বানিশান্তা: বিস্মৃত নারীদের এক জনপদ

0
2679
ছবি: Alessandro Grassani/Invision Images

‘জন্মের অভ্যর্থনা এখানে গম্ভীর, নিরুৎসব, বিষণ্ন। জীবনের স্বাদ এখানে শুধু ক্ষুধা ও পিপাসায়, কাম ও মমতায়, স্বার্থ ও সংকীর্ণতায়। ঈশ্বর থাকেন, ওই ভদ্রপল্লীতে। এখানে তাঁহাকে খুঁজিয়া পাওয়া যাইবে না।’ পদ্মা পাড়ের জেলে জনপদের ‘অচ্ছূত’ জীবনযাপনের যে চিত্র মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তুলে ধরেছেন তা যেন আবহমানকাল ধরে বিরাজমান নদীকেন্দ্রিক বিস্মৃত জনগোষ্ঠীর এক অবিচ্ছেদ্য রূপ।

একদিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগের থাবা, অন্যদিকে ‘ভদ্র সমাজের’ রক্তচক্ষু এই দুইয়ের মাঝে যেন বন্দি পশুর নদীর তীরে মংলা বন্দরের কোল ঘেষে গড়ে ওঠা বানিশান্তা যৌনপল্লীর শেকড়ছেঁড়া, বাস্তুহীন নারীদের জীবন।

২০০০ সালে হাইকোর্টের রায় অনুযায়ী বাংলাদেশে যৌনব্যবসা আইনত বৈধ, যা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশসমূহের মধ্যে বিরল। আইন অনুসারে কেবল প্রাপ্তবয়স্ক নারীরা (১৮ বছরের অধিক) জীবন ধারণের কোনো উপায় না থাকায় স্বেচ্ছায় কোনো বলপ্রয়োগ ছাড়া আদালতে ঘোষণা দিয়ে পেশাদার যৌনকর্মে নিয়োজিত হতে পারেন।

বাংলাদেশের নিবন্ধনকৃত ১৪টি যৌনপল্লীগুলির মধ্যে বানিশান্তা একটি।

এখানকার যৌনকর্মী শিরিন আক্তার মালা, কাজ করছেন ১৭ বছর যাবৎ। চাকুরির প্রলোভন দেখিয়ে ১৩ বছর বয়সী মালাকে বিক্রি করে দেওয়া হয় খুলনার ফুলতলার যৌনপল্লীতে। সেখান থেকে হাত বদল হয়ে চলে আসেন বানিশান্তায়। মালা বলছিলেন, ‘বন্দরের জাহাজের কর্মীরা ছিল এখানকার বড় খদ্দের। কিন্তু বন্দর জমজমাট না থাকায় এখন আর তেমন উপার্জন নেই৷সপ্তাহের ছুটির দিনগুলোতে ঘুরতে আসা স্থানীয় কিছু লোকজন এখানে আসে। সেখান থেকে সপ্তাহে গড়ে প্রায় দেড় দুই হাজার টাকা আয় হয়। করোনায় লকডাউনের কারণে পরিস্থিতি আরা ভয়াবহ ছিল।’

‘মাস শেষে আমি যে টাকা পাই তার অর্ধেক আমার থাকা খাওয়া বাবদ দিয়ে দিতে হয় বাড়িওয়ালাকে। আর কিছু টাকা মায়ের কাছে পাঠাই।’

ত্রিশোর্ধো মালার কাছে জানতে চেয়েছিলাম, পেশাদার যৌন সম্পর্কের বাইরে কারো প্রতি ভালোবাসা তৈরি হয়েছে কিনা, কিংবা ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখেছেন কখনও।

নদীর দিকে শূন্যদৃষ্টে তাকিয়ে মালা বলছিলেন, ‘অনেকের কাছ থেকে নির্যাতনের শিকার হয়েছি, তবে একজনকে ভালোবেসেছিলাম। এই পল্লী ছেড়ে পালিয়ে গিয়ে বিয়েও করি, স্বপ্ন দেখেছিলাম সবকিছু ভুলে নতুন করে স্বাভাবিক জীবন শুরু করবো। কিন্তু একদিন বুঝতে পারলাম যে, সে আমাকে ভারতে পাচার করতে চায়। তাই আবারো বাধ্য হয়ে ফিরে আসলাম। সবাই শুধু আমারে ব্যবহারই করলো।’

যৌনপল্লীতে থাকা নারীরা সমাজের সবথেকে কম সুবিধাভোগী এবং বিভিন্ন সময়ে ঘটা নানা দুর্ঘটনার ফলাফল হিসেবে তারা এই পেশায় জড়িত আছেন। যৌনকর্মীদের ভাষায় এটা হলো ‘স্বেচ্ছায় দাসত্ব’। ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা একে চিহ্নত করেছেন , ‘যাদের পছন্দ নেই তাদের পছন্দ করে নিন’ হিসাবে।

ছবি: সংগৃহীত (আলেসান্দ্রো গ্রাসানী)

সাথী (ছদ্মনাম) বানিশান্তা পল্লীর এমনই একজন যৌনকর্মী। বাবা মারা যাওয়ার পর মা আর বোনদের দায়িত্ব নিতে পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হিসেবে কাজ করতে গিয়ে নানাভাবে হয়রানির শিকার হয়েছেন। তাই স্বেচ্ছায় নাম লিখিয়েছেন এই পেশায়। পরিবারের সদস্যরা জানলেও আত্মীয় স্বজনদের কাছে গোপন করেছেন বিষয়টি। প্রায় ২০ বছর তিনি স্বাধীনভাবে কাজ করছেন যৌনকর্মী হিসেবে।

সাথী তার অন্য বোনদের মতো সংসার করার স্বপ্ন দেখেছিলেন। কিন্তু কেন তিনি নিজেকে দাসত্বের জীবনে বন্দি করলেন, এমন প্রশ্নের উত্তরে জানালেন,‘আমি যখন না খেয়ে ছিলাম, তখন কেউ আমাকে সাহায্য করেনি, আমি যৌনকর্মীর কাজ করে পেট চালায় সেটাকে কেউ ভালো চোখে দেখবেনা, আবার যদি ফিরে যেতে চাই তাও আমাকে কেউ গ্রহণ করবেনা। তাই আমার জীবনকে আমি এভাবেই মেনে নিয়েছি।’

২০১৭ সালে বানিশান্তা যৌনপল্লীতে ২০০ জন যৌনকর্মী সেবা দিয়ে আসলেও ২০২১ সালে তাদের সংখ্যা ৯৫ জনে এসে ঠেকেছে। এর বাইরে যৌনপল্লীতে জন্ম নেওয়া মেয়ে শিশুরাও মায়ের পথ অনুসরন করে নিযুক্ত হয় যৌন পেশায়। আর ছেলে শিশুরা দালাল হিসেবে তৈরি হয়।

বানিশান্তা যৌনপল্লীর বয়োজ্যেষ্ঠ নিবাসী রওশনারা। ১৬ বছর বয়সী এক ছেলে সন্তান নিয়ে ৪০ বছর ধরে বসবাস করছেন এখানে। বিয়ের পর স্বামী জোর করে রেখে যায় এই যৌনপল্লীতে। সেখান থেকে শুরু হয় তার নতুন জীবনের গল্প। সেই থেকে নানা ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে চারটি দশক পার করেছেন যৌনপল্লীতে। খদ্দরের কাছে বয়স্ক যৌনকর্মীদের চাহিদা কম থাকায় তিনি এখন বাড়িওয়ালি ও দোকান মালিক হিসেবে পরিচিত। তার অধীনে কাজ করেন অল্পবয়সী মেয়েরা। তিনি বলছিলেন, ‘এই পল্লী আমার বাড়ি, আমার সম্বল।’ বাড়ি বলতে টিন আর বাঁশের বেড়ার খুপরি ঘর। কিন্তু প্রত্যেক বছরই নতুন করে বাঁধতে হয় তাদের এই ঘরবাড়ি।

রওশনারা বলছিলেন, ‘ওই যে নদী দেখছেন, প্রায় মাঝ বরাবর ছিল আমাদের পল্লী। প্রত্যেকবছর বুলবুল, আম্ফান এর মতো ঝড়, বন্যায়, কিনার ভাঙ্গতে, ভাঙ্গতে প্রায় গ্রামের মধ্যে ঢুকে গেছি আমরা। এক ঘর যে কয়বার বাঁধছি তা হিসাব করে বলতে পারবো না। যেটুকু সঞ্চয় থাকে, তাও চলে যায় নদীর পেটে।’

বানিশান্তা যৌনপল্লী, ছবি: রুবেল পারভেজ

‘গ্রামের লোকজনও আমাদেরকে ভালো চোখে দেখেনা। উচ্ছেদ করার হুমকি দেয়। একসময় তো আমাদের জুতা পায়ে দিয়ে হাটার অধিকার ও ছিলনা। বাজার ঘাট, প্রয়োজনীয় জিনিস সবই এই পল্লীর মধ্য থেকে জোগাড় করতে হয়।’

‘এই পল্লীর কোন মেয়ে মারা গেলে লাশের সৎকার করা হয়না। দাফনের কোনো জায়গা আমাদের দেওয়া হয়না। নদীতে লাশ ভাসায় দিই’- বলছিলেন রওশনারা।

আমাদের ‘ভদ্র সমাজ’ ধর্ম ও নৈতিকতার দোহাই দিয়ে, কোনো ধরণের সমাধানের পথ তৈরি না করে এসব রওশনারা, লিপি ও মালাদেরকে ঠেলে দিচ্ছে প্রাকৃতিক বিনাশের পথে। আবার প্রকৃতিও যেন তাদেরকে উগরে দিচ্ছে সমাজের পানে। সমাজ আর প্রকৃতির এই খেলায় বানিশান্তার বিস্মৃত বিষাদগণিকাদের ভবিতব্য কী তবে প্রকৃতির হাতেই লেখা আছে!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here