
কাবুলের উপর জাহান্নামের দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ঠিক আগ মুহূর্তে বিমানে সওয়ার হয়েছিলো কজন। রবিবার খুব ভোরে বৃটেনে অবতরণ করে তারা। বিমান থেকে নেমে যাত্রীরা কারও কাছ থেকে পায় নায়কোচিত স্বাগতম আবার কারো কাছ থেকে লজ্জাজনক নীরবতা। এই মিশ্র প্রতিক্রিয়ার পেছনে কারণ একটাই। বিমানের যাত্রীরা সেইসব হতাশ আফগান নন যারা বিমানবন্দরের বাইরে দিনের পর দিন হাঁটু গেড়ে নর্দমায় পড়েছিল বাঁচার আশায়, বরং তারা হল একদল বিড়াল এবং কুকুর।
আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিলো, ‘আমার পাঁচ বছরের বাচ্চাটির জীবনের দাম একটা কুকুরের চেয়েও কম কেন?’ আমার কাছে এর কোনো উত্তর ছিল না।
বৃটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রী কিছুটা শ্রবণযোগ্যভাবেই দাঁত কিড়মিড়িয়ে নিশ্চিত করেছেন, ব্যক্তিগত চার্টার্ড বিমানে করে প্রাক্তন সৈনিক ওরফে প্রাণী উদ্ধারকর্মী, পল ‘পেন’ ফার্থিং এবং তার সঙ্গে থাকা সব প্রাণীদের ফিরিয়ে আনার জন্য ব্রিটিশ বাহিনী যেভাবে সহায়তা করেছে, তার বিপরীতে কাবুল বিমান বন্দরের সেই অতর্কিত পরিস্থিতিতে শেষ সময়ে অপেক্ষমান মানুষেরা, এমনকি যারা পশ্চিমা বাহিনীর উপর আস্থা রেখে তাদের সঙ্গে কাজ করেছিলো, তাদেরকেও ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দিয়ে আসা হচ্ছিল।
টরি এমপি এবং প্রাক্তন সৈনিক টম টুগেনহাট, যিনি একজন পুরনো সেনা দোভাষীকে যুক্তরাজ্যে নিয়ে যাওয়ার জন্য চেষ্টা চালিয়েছেন, তিনি বলেছিলেন- ‘আমরা মাত্রই ২০০ টি কুকুরের জন্য প্রচুর সৈন্য ব্যবহার করেছি, অথচ আমার দোভাষীর পরিবারকে হয়তো ইতোমধ্যেই হত্যা করা হয়েছে।’
কয়েকদিন আগে যখন একজন দোভাষী আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিলো, ‘আমার পাঁচ বছরের বাচ্চাটির জীবনের দাম একটা কুকুরের চেয়েও কম কেন?’ আমার কাছে কোনো উত্তর ছিল না।’
এই মানবসৃষ্ট বিশৃঙ্খলার মাঝে, বিশ্বকে আমাদের সম্পর্কে বলার মতো কী অসাধারণ গল্প এটি। পশ্চিমাবিশ্ব অন্য নাগরিকদের জীবনকে অবমাননাকরভাবে সস্তা মনে করে এই ধারণা যাদের কাজে ইন্ধন দেয়; সেসব মধ্যপ্রাচ্য এবং এর বাইরের চরমপন্থী আন্দোলনকারীদের জন্য এই ঘটনা কী উপহারস্বরূপ নয়?
যাদের ব্যাপারে তালেবানদের বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই, সেসব বিড়ালকে বিমানে করে বের করে আনা যেতে পারে কিন্তু মৃত্যুর ঝুঁকিতে থাকা মানুষদের নয়। এমনকি ফার্থিংয়ের আফগান কর্মীরা, যাদের ব্যাপারে তিনি জোর দিয়ে বলেছিলেন যে তাদের তিনি বের করে নিয়ে আসবেন, তারাও বিমানবন্দরে কাগজপত্র প্রত্যাখ্যান হওয়ার ফলে শেষ পর্যন্ত ছাড়া পড়ে গিয়েছিলো।
কাবুলে যে বিপর্যয় ঘটছে তা অবশ্যই ফারথিংয়ের দোষ নয়। নিন্দুকেরা বলতেই পারেন যে, তার উদ্ধার অভিযান নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্কটি ২০ বছরের দখলদারিত্বের সরকারের এই বিপর্যয়কর অবসানের ঘটনা থেকে চোখ ফেরানোর জন্য একটি বিভ্রান্তি ছিল।
কিন্তু সামরিক মহলে আসল ক্ষোভ এবং হতাশার খবর মিলেছে। তারা শুধু ফারথিংয়ের ওপর ক্ষুদ্ধ নয়, কিছু ব্রিটিশ সমর্থকদের উপরেও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন, যারা রীতিমতো মন্ত্রী এবং এমপিদের উপর ক্ষুব্ধ টুইট ও ইমেইলের বোমাবর্ষণ করে প্রাণীদের জন্য কিছু করার দাবি করেছিল। এমন একটা পরিস্থিতিতে তারা এটি করছিল, যখন প্রতিটি সেকেন্ডই মুল্যবান।
গভীর মানসিক আঘাতের স্মৃতি বয়ে বেড়ানো প্রবীণ সৈন্যদের জন্য এটা জানতে পারা খুবই কষ্টকর যে, তাদের পুরাতন সহকর্মীদের বদলে কিছু মানুষ কুকুর বিড়াল বাঁচানোর ব্যাপারে বেশি তৎপর। সুতরাং এটা মোটেও বিস্ময়কর নয় যে, কেউ একজন ফারথিংয়ের বিব্রতকর ফোনকলের বিষয়বস্তু ফাঁস করে দিয়েছিল, যেখানে সে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন সিনিয়র সহকারীকে, যদি সে তার মিশনের জন্য ছাড়পত্র না পায় তবে, গণমাধ্যমে ‘তোমাকে ধ্বংস করে দেবো’- বলে হুমকি দিয়েছিল।
এসব রাজনৈতিক রেশারেশির কথা না হয় বাদই দিলাম। কিন্তু আট হাজার বা তার বেশি আফগান শরণার্থীদের এখন তাৎক্ষণিক ব্যবহারিক সাহায্যে, যেমন ধরি- কোট এবং জুতা, প্রসাধন সামগ্রী এবং শিশুদের খেলনা, যা ইতোমধ্যেই জনসাধারণের পক্ষ থেকে প্রচুর পরিমানে দেওয়া হচ্ছে- কেবলমাত্র এসবের প্রয়োজন নেই। বরং দরকার সেদেশে তাদেরকে থিতু হতে সহায়তা করা, অথচ ব্রিটেনে প্রতি বছর অভিবাসী আইন কঠোর হয়েই চলেছে।
আসল হিসেবটি ব্রিটেন বিমান থেকে নেমে আসা কতিপয় ভাগ্যবানদের সাথে কীরূপ আচরণ করছে তা দিয়ে নয়, বরং আগামীতে অবশ্যম্ভাবী আরো হাজার হাজার শরণার্থীদের সঙ্গে বৃটেন কেমন আচরন করছে তা দিয়েই হবে।
আগামী কয়েক বছরে হতাশ আফগানরা তাদের জীবনের সঞ্চয় তুলে দিতে চলেছে মানব চোরাচালানকারীদের হাতে। তারা নৌকায় চেপে, লরিতে দাঁড়িয়ে- যেমনটি কয়েক বছর ধরেই করা হচ্ছে- এসে পৌঁছুবে আশ্রয়দাতা দেশগুলোতে। কিন্তু এবার তাদের দাবি হবে অনেক বেশি নৈতিক ও জোরালো।
মোদ্দাকথা, ব্রিটেন বেশ কঠিনভাবে বুঝতে চলেছে যে, বাইরের পৃথিবী থেকে দূরে সরে আসার চেষ্টা করলে একসময় পৃথিবীই এসে হাজির হবে তোমার কাছে। এখন দেখার বিষয় ব্রিটেনের প্রতিক্রিয়া কি হয়।
লেখক: গ্যাবি হিন্সলিফ, দ্য গার্ডিয়ান।
ভাষান্তর করেছেন অনন্যা দাশ