মধ্যপ্রাচ্য সংকট ও নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিতে চাই কার্যকর পদক্ষেপ

নিরাপদ অভিবাসন, মধ্যপ্রাচ্য সংকট

বিগত কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হলো প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্স। আর এই শ্রম অভিবাসনের সিংহভাগই আবর্তিত হয় মধ্যপ্রাচ্যকে (বিশেষ করে সৌদিআরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, জর্ডান ইত্যাদি) কেন্দ্র করে (BMET’র সূত্র মতে: মোট অভিবাসনের প্রায় ৮২.৪% GCC দেশগুলোতে হয়েছে)।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমাগত বাড়তে থাকা ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সংঘাত বাংলাদেশের শ্রমবাজারের জন্য এক গভীর সংকটের বার্তা দিচ্ছে। বিশেষ করে ইরান-ইজরাইল-যুক্তরাষ্ট্রর যুদ্ধ ও হরমুজ প্রণালী সংকট অভিবাসীদের জন্য ও বাংলাদেশে থাকা তাদের পরিবারের জন্য বেশ উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য মতে, ওই অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার ফলে ২০২৬ সালের মার্চ মাস নাগাদ প্রায় ৬৫,০০০ কর্মী মধ্যপ্রাচ্যে যেতে গিয়ে ফ্লাইট বাতিল ও ভিসা জটিলতার মুখে পড়েছেন। ‘মধ্যপ্রাচ্য সংকট ও শ্রম অভিবাসনে বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ’ এখন জাতীয় অর্থনীতির জন্য একটি অন্যতম উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সংকটের পটভূমি:
গাজা ইস্যু থেকে শুরু করে ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনা এবং লোহিত সাগরে অস্থিরতা-সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্য এখন বলতে গেলে এক আগ্নেয়গিরির ওপর দাঁড়িয়ে। এই অস্থিতিশীলতা এক দিকে যেমন ওই সকল দেশের পর্যটন ও তেল-ভিত্তিক বাণিজ্যের উপরে প্রভাব ফেলছে, তেমনি সরাসরি প্রভাব ফেলছে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া শ্রমিকদের অবস্থান, জীবন-যাপন ও কর্মসংস্থানের ওপর। বিশেষ করে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার এবং কুয়েতের মতো দেশগুলো যখন তাদের নিরাপত্তা ও অর্থনীতি নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকে, তখন তার প্রথম প্রভাব পড়ছে বিদেশি শ্রমিক নিয়োগের ওপর। অস্থায়ী কাজ, দৈনিক মজুরি বা ব্যবসা কেন্দ্রিক কাজ ইত্যাদি মিজাইল হামলার আশংকায় প্রায়শই বন্ধ থাকার দরুন কিছু নেতিবাচক প্রভাব রেমিট্যান্সের প্রবাহে পড়ছে। তার উপরে অভিবাসী শ্রমিকদের জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে দেশের প্রিয়জনেরা রয়েছে উদ্বিগ্ন। অন্য দিক এর প্রভাবে ইউরোপ অবৈধ উপায়ে অভিবাসনের চেষ্টা মানব পাচারের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলতে পারে বলে আশংকা করা হচ্ছে। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় যদিও প্রবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও কল্যাণে বেশ কিছু কূটনৈতিক উদ্যোগ ও পদক্ষেপ নিয়েছে – কিন্তু এই সংকট দীর্ঘ মেয়াদি হলে আমাদেরকে মধ্যপ্রাচ্য কেন্দ্রিক শ্রম অভিবাসন থেকে বের হয়ে অন্যত্র বৈদেশিক কর্মসংস্থানের চিন্তা করতে হবে।

বাংলাদেশের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জসমূহ:

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র বা ইজরাইল এই তিন পক্ষ কোনো দীর্ঘমেয়াদি শান্তি চুক্তিতে না যেতে পারলে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থারত অভিবাসী শ্রমিকদের অবস্থা আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়বে, তার সাথে বাংলাদেশে প্রেরিত রেমিট্যান্সের প্রবাহতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বৈকি। সার্বিক দিক বিবেচনা করলে বাংলাদেশেকে সম্ভাব্য বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি পড়তে হবে।

১. নতুন কর্মসংস্থান সংকুচিত হওয়া: যুদ্ধাবস্থার কারণে মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশে বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্পের গতি ধীর হয়ে গেছে। নতুন অবকাঠামো বা মেগা প্রজেক্টে বিনিয়োগ না করে এখন তারা দেশের সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে ও নিরাপত্তা জোরদার করতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করছে। ফলে নতুন করে বাংলাদেশ থেকে স্বল্প দক্ষ বা অদক্ষ কর্মী নেওয়ার চাহিদা আশঙ্কাজনকভাবে কমছে।

২. কর্মসংস্থান হারানো ও প্রত্যাবাসন: সংঘাতপূর্ণ এলাকায় অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশিরা জীবনের ঝুঁকিতে রয়েছেন। ইতিমধ্যে ৫ জন বাংলাদেশী শ্রমিক মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে মিজাইলের ইন্টারসেপ্টর বা সরাসরি আঘাতে প্রাণ হারিয়েছেন। তাছাড়া জর্ডান, লেবানন বা লোহিত সাগর সংলগ্ন অঞ্চলে কর্মরত অনেকেই কর্মস্থল ত্যাগ করতে বাধ্য হচ্ছেন। পরিস্থিতি কোনো কারণে আরও অবনমন হলে হঠাৎ বিপুল সংখ্যক শ্রমিকের দেশে ফিরে আসা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ শ্রমবাজারে বাড়তি চাপ তৈরি করবে-যেমনটা COVID-19 সময়কালে আমরা দেখেছি।

৩. আর্থিক লেনদেন ও মুদ্রাস্ফীতি: মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার কারণে তেলের বাজার অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে -যেখানে বর্তমানে প্রতি ব্যারেল ক্রুড অয়েল $১০৪ মার্কিন ডলারের বিক্রি হচ্ছে, যার মূল্য ৪ মাস পূর্বেও ব্যারেল প্রতি জানুয়ারিতে ছিল মাত্র $৬৬ মার্কিন ডলার। এর ফলে বিশ্বজুড়ে সড়ক-নৌ-আকাশ পথে পরিবহন খরচ বাড়ছে এবং ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমার ঝুঁকি ক্রমশ তীব্র হচ্ছে। ক্ষেত্র বিশেষ দেখা গিয়েছে প্রবাসীরা ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ে দক্ষ না হওয়াতে জেনারেল ব্যাংকিং চ্যানেলে টাকা পাঠাতে গিয়ে নানা জটিলতার সম্মুখীন হচ্ছেন, যা রেমিট্যান্স প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করছে।

৪. শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষার অভাব: অস্থিরতার সুযোগে অনেক ক্ষেত্রে প্রবাসী শ্রমিকরা বেতন বঞ্চনা বা মালিকপক্ষের শোষণের শিকার হচ্ছেন; বিশেষ করে স্বল্প দক্ষ বা অদক্ষ শ্রমিকেরা বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে কূটনৈতিক তৎপরতা কমে যাওয়ায় শ্রমিকদের আইনি সুরক্ষা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। তাছাড়া জুলাই অভ্যুত্থানের পরে জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন গঠিত সরকারকে বিগত ১৫ বছরের কূটনৈতিক চর্চার বেশ পরিবর্তন করতে হচ্ছে – ফলে বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত বাংলাদেশী শ্রমিকদের কল্যাণ ও সুরক্ষার জন্য নতুন নতুন পদক্ষেপ ধীরে ধীরে নিতে হচ্ছে; পর্যালোচনা করতে হচ্ছে বিগত সরকারের আমলে করা বিভিন্ন দেশের সাথে সকল দ্বিপাক্ষিক চুক্তি সমূহ। যা অভিবাসী ও শ্রম অভিবাসন প্রত্যাশী শ্রমিকদের আর ঝুঁকির ভিতর ফেলছে।

৫. মানব পাচারের ঝুঁকি বৃদ্ধি: মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে অনেকে মধ্যপ্রাচ্য হতে বা বাংলাদেশ হতে ইউরোপ, মালয়েশিয়া বা অস্ট্রেলিয়াতে ঝুঁকিপূর্ণ মাধ্যমে যাওয়ার চেষ্টা করতে পারে -যা তাদের মানব পাচারের বা জোরপূর্বক শ্রম দাসত্বের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে। এই সময়ে অনেক মানব পাচারকারী ও দালালেরা সক্রিয় হয়ে উঠে। এই ধরণের মানব পাচারের ঘটনা বা ঝুঁকি প্রতিহত করতে সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে সক্রিয় ও কার্যকরী ভূমিকা নিতে হবে।

উত্তরণের পথ:

বিশেষজ্ঞদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের একক নির্ভরতা কাটিয়ে এখন বাংলাদেশের জন্য ‘বাজার বৈচিত্র্যকরণ’ বা ‘মার্কেট ডাইভারসিফিকেশন’ অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বরং পূর্ব ইউরোপ, পূর্ব এশিয়া এবং দূরপ্রাচ্যের দেশগুলোতে চাহিদা ভিত্তিক দক্ষ জনশক্তি পাঠানোর দিকে নজর দিতে হবে।

জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া কেয়ারগিভার, নার্সিং পেশাতে বেশ কিছু অভিবাসী শ্রমিকদের নিয়োগ দিয়েছে ও ধারণা করা হচ্ছে আগামীতে তাদের এই দুই পেশাতে অনুমানিক ২০ লক্ষের বেশি দক্ষ শ্রমিকের প্রয়োজন। এর জন্য আবশ্যিক ভাষার দক্ষতা ও সংশ্লিষ্ট কর্ম ক্ষেত্রে জন্য আধুনিক প্রযুক্তির উপরে জ্ঞান।

অভিবাসী শ্রমিক নিয়োগের দেশ ভিত্তিক দ্বিপাক্ষিক চুক্তি (Bilateral Agreement and MoUs) সম্পাদনের পাশাপাশি বিদেশী ভাষার ও ট্রেড ভিত্তিক কারিগরী দক্ষতা উন্নয়নের জন্য ১১০টি  কারিগরী প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও ৫৪টি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটগুলোকে উপযোগী করে তুলতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন আন্তর্জাতিক মানের কোর্স কারিকুলাম, আধুনিক প্রশিক্ষণ উপকরণ, ও দক্ষ প্রশিক্ষকের। একটি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (এনএসডিএ) এর অধীনে ‘স্কিল ম্যানপাওয়ার ডেভেলপমেন্ট ফ্রেমওয়ার্ক’ তৈরী করে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে পদক্ষেপ নিতে হবে।

সাশ্রয়ী ও নিরাপদ শ্রম অভিবাসন নিশ্চিতকরণের জন্য প্রয়োজন রিক্রুটিং এজেন্টগুলোর ‘সিন্ডিকেট ব্যবসা’ নিয়ন্ত্রণ করা ও দালালদের (Sub-agent) নীতিগত কাঠামোর ভিতর এনে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। এর জন্য তদারকি কর্তৃপক্ষ যেমন: BMET-কে নিয়মিত মনিটরিং, অডিট (Audit) ও কমপ্লায়েন্স চেকিং করার উদ্যোগ নিতে হবে।

পাশাপাশি, ‘ট্যালেন্ট পার্টনারশীপ’ এর মাধ্যমে ‘দক্ষ শ্রমিক’ (STEM-Science, Technology, Engineering and Mathmatics এ দক্ষ) এর অভিবাসন নিশ্চিতকরণ; দেশ অবস্থিত অভিবাসীর পরিবারের আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, ও প্রত্যাবর্তিত শ্রমিকদের কার্যকর পুনর্বাসনের জন্য উদ্যোগ নিতে হবে। ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বর্ডার ফান্ড ছাড়াও প্রয়োজনে সরকারি কোষাগার থেকে অর্থের বরাদ্দ দিয়ে অভিবাসীর কল্যাণে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিতে হবে।

মধ্যপ্রাচ্যের সংকট শুধু ওই অঞ্চলের রাজনৈতিক বিষয় নয়, এটি বাংলাদেশের লাখ লাখ পরিবারের জীবন-জীবিকার সাথে জড়িত। সরকারের কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করার পাশাপাশি প্রবাসী শ্রমিকদের সুরক্ষায় একটি দীর্ঘমেয়াদী এবং টেকসই অভিবাসন নীতি গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি।

লেখক: শ্রম অভিবাসন বিশ্লেষক ও অধিকার কর্মী

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here