শুক্রবার, 4 এপ্রিল, 2025

সীমানা আর কাঁটাতারকে বিলীন করেছিল লতা মঙ্গেশকরের গান

দেশভাগ, সীমান্ত, কাঁটাতার কখনো এক মুহূর্তের জন্য বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি সুরসম্রাজ্ঞী লতা মঙ্গেশকরের কাছে। লতা মঙ্গেশকরের সুর প্রচন্ড শক্তি নিয়ে দাঁপিয়ে বেড়িয়েছে এক দেশ থেকে আরেক দেশে। কোনো বিভক্তির রাজনীতি লতার সুর আর শ্রোতার মাঝখানে প্রভাব রাখতে পারেনি। যে কারণে বহু ভাষায়, বহু দেশে লতা অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে চলেছেন বিরতিহীনভাবে। আর এভাবেই দশকের পর দশক ধরে তিনি কোটি কোটি সাধারণ শ্রোতার হৃদয়ের মনিকোঠায় জায়গা করে ছিলেন।

সুরের রানী লতা মঙ্গেশকরের খুব ইচ্ছে ছিল ভারত-পাকিস্তানের হৃদ্যতা দেখার। বলেছিলেন, তিনি খুব খুশি হবেন, যদি তার গান এই দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে। শুনতে অবাক লাগলেও এটা সত্য যে, লতা মঙ্গেশকর তার দীর্ঘ ৯২ বছরের জীবনে একবারের জন্যও প্রতিবেশি দেশ পাকিস্তানে বেড়াতে যেতে পারেননি। অবশ্য পাকিস্তানের প্রয়াত জেনারেল জিয়া-উল-হক এর শাসনামলের সময় একবার বেশ ঘটা করে তাকে পাকিস্তানে পারফর্ম করার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। কিন্তু একেবারের শেষ মুহূর্তে এসে সেই অনুষ্ঠানটি বাতিল করে দেয়া হয়েছিল। ফলে সেবার আর পাকিস্তানে যাওয়া হয়নি তার।

পাকিস্তানে না যেতে পারা নিয়ে যথেষ্ঠ আক্ষেপ ছিল লতা মঙ্গেশকরের। একটি নিউজ চ্যানেলকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে লতা এ প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘সবকিছুই চূড়ান্ত করা হয়েছিল। এরপর একেবারে শেষ মুহূর্তে সেই শোটি বাতিল করা হয়েছিল। আয়োজকরা সাফ জানিয়ে দিয়েছিল, তারা অনুষ্ঠানটির কোনো দায়-দায়িত্ব নিতে পারবে না।’

পাকিস্তানে শোটি বাতিল হওয়ার পর লতা এর কারণ খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছিলেন। এর কারণও উদঘাটন করেছিলেন তিনি। ‘যখন জিয়া সাহেব ক্ষমতায় ছিলেন, একজন কবি আমাকে পাকিস্তানে পারফর্ম করার জন্য রাজি করিয়েছিলেন। যাবতীয় সব আয়োজন প্রস্তুত করা হয়েছিল এবং শিল্পীরাও পারফর্ম করার জন্য প্রস্তুত ছিল। একথা জানার পর জিয়া সাহেব সেই কবিকে ডেকে পাঠান এবং তার পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চান। সেই কবি, যিনি কিনা পুরো অনুষ্ঠানের সংগঠক ছিলেন। তিনি তার পরিকল্পনা সবিস্তারে জিয়া সাহেবকে জানালেন এবং জিয়া সাহেব তা শুনে তার দিকে তাকালেন এবং হাসি দিয়ে বললেন, ‘আচ্ছা, তাহলে আপনি কি চান পাকিস্তানের মানুষ লতাজির গানের শোয়ে ভিড় করে আমাকে ভুলে যাক? আমি জানি এখানকার লোকেরা তার জন্য কতোটা পাগল!’

সেই অনুষ্ঠান বাতিলের পর অনেকটা সময় পেরিয়ে গেছে। অনেকে হয়তো ভেবেছেন লতা মঙ্গেশকর আর হয়তো পাকিস্তানে বেড়াতে যেতে চান না। কিন্তু বিষয়টি মোটেও এমন নয়। কয়েক বছর আগে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘পাকিস্তানে যাওয়ার খুব ইচ্ছা আমার। কিন্তু গত ২০ বছর যাবত আমাকে কেউ কখনো আমন্ত্রণ জানায়নি। যদি কেউ আমাকে আমন্ত্রণ জানায় তাহলে আমি আসবো।’

তিনি আরো বলেছিলেন, ‘আমি জানি না কত দিন আর কত বছর পেরিয়ে গেছে; আমি অনেক দেশে পারফর্ম করেছি, বিদেশে ২৬টির বেশি ভাষায় হাজারো গান গেয়েছি এবং আমি অনেক দেশ ঘুরেছি। কিন্তু সময় এত দ্রুত বয়ে চলে যে, বুঝতেই পারিনি আমি এখনো পাকিস্তানে যেতে পারিনি। যেখানে আমার অনেক বন্ধু বসবাস করে। যেখানে লাখ লাখ ভক্ত আমাকে পারফর্ম করাতে চেয়েছে।’

পাকিস্তানি সংগীতশিল্পী নূর জাহানের সঙ্গে লতা মঙ্গেশকর। ছবি সৌজন্যে: দ্য ডন

তিনি আরো বলেন, ‘আমি নূর জাহানের সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিলাম, আমি অনেকটা সময় তার সঙ্গে কাঁটাতে চেয়েছি। আমি ফরিদা খানম, মেহেদি হাসান সাহেবকে দেখতে চেয়েছিলাম। কিন্তু এটা হলো না।’

আজ থেকে ১৪ বছর আগে দেয়া সেই সাক্ষাৎকারে লতা মঙ্গেশকর তার দীর্ঘ জীবনের বন্ধু নূর জাহানকে নিয়েও স্মৃতিচারণ করেছিলেন। ‘ভারত ভাগের পর যখন তিনি অভিবাসিত হয়ে পাকিস্তানে চলে গেলেন তখন আমি তাকে প্রতিদিনই ফোন করতাম। আমরা আমাদের সম্পর্ক রক্ষা করেছি। কিন্তু আমি আর তার সঙ্গে দেখা করতে পারিনি।’ আক্ষেপ আর দীর্ঘশ্বাস নিয়ে কথাগুলো বলছিলেন লতা মঙ্গেশকর।

পাকিস্তানের প্রখ্যাত শিল্পী মেহেদি হাসানের সঙ্গেও লতা মঙ্গেশকরের অসাধারণ সম্পর্ক ছিল। লতা জানিয়েছেন, মেহেদি হাসান তাকে নিয়ে সঙ্গীত তৈরী করতে চেয়েছিলেন। এমনকি প্যারালাইসিসে আক্রান্ত হয়ে সুস্থ হয়ে ওঠার পরই তিনি ভারতে গিয়ে তার এই পরিকল্পনা নিয়ে লতার সঙ্গে আলোচনা পর্যন্ত করেছিলেন।

এ নিয়ে লতা স্মৃতিচারণ করেন এভাবে, ‘মেহেদি হাসান সাহেব, আমার ছোটো ভাই-সঙ্গীতজ্ঞ (পণ্ডিত) হৃদয়নাথ মঙ্গেশকর এবং আমি ওই পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেছিলাম। একজন কবির সঙ্গেও কথা বলেছিলাম, যিনি এরই মধ্যে কয়েক পংক্তি লিখেও ফেলেছিলেন। আমরা একটি গজল নির্বাচন করেছিলাম এবং রিহার্সেল শুরু করে দিয়েছিলাম। সবকিছুই ঠিকঠাক এগোচ্ছিল।

আমাদের গজল ‘তেরা মিলনা আচ্ছা লাগা’ রেকর্ডও হয়ে গিয়েছিল। আমরা এর নাম দিয়েছিলাম সারহাদিইন (সীমানা)। আমি মেহেদি হাসান সাহেবের কম্পোজিশনে গেয়েছিলাম, যেমনটা তিনি চেয়েছিলেন এবং তার চেয়েও বড় কথা, এটি ছিল একটি দ্বৈত গান! খান সাহেবের সঙ্গে গান গাইতে পেরে ভালো লেগেছিল। এটা আমাদের দুজনের জন্যই বিশেষ কিছু ছিল এবং আমার মনে আছে, এই কারণেই আমরা গানটিকে সঠিকভাবে বাজারে ছাড়ার ব্যাপারে ভাবিনি।’

২০১১ সালে মেহেদি হাসান ও লতা মঙ্গেশকর এই দ্বৈত গানটি করেছিলেন। একসঙ্গে গাওয়া এটি ছিল তাদের দুজনের প্রথম এবং শেষ গান। গানটিতে পাকিস্তান ও ভারত থেকে চারজন করে শিল্পী পারফর্ম করেছিল। মেহেদি হাসানেরও প্রচন্ড ইচ্ছা ছিল লতা পাকিস্তানে গিয়ে গান রেকর্ড করবেন। কিন্তু পরম আকাঙ্ক্ষিত সেই মুহূর্তটি আর কখনো বাস্তবে রূপ নেয়নি।

টাইমস অব ইন্ডিয়ায় প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে একজন সাক্ষাৎকারগ্রহিতা লতা মঙ্গেশকরকে অবহিত করেছিলেন যে, একজন পাকিস্তানি কবি একটি কবিতা লিখেছিলেন। সেই কবিতায় কাশ্মীর প্রসঙ্গে একজন ভারতীয় ও একজন পাকিস্তানিকে একটি চায়ের দোকানে যুক্তিতর্ক করতে দেখা যায়। এসময় তাদের মধ্যে তুমুল ঝগড়া বেধে যায়। এমন সময় ওখানে থাকা চা দোকানি তার ক্যাসেটে লতা মঙ্গেশকরের গাওয়া একটি গান চালিয়ে দেন। দেখা গেল এই গান শুরুর পর বিবাদমান দুজনই নিজেদের মধ্যকার ঝগড়া থামিয়ে দেন এবং ক্যাসেটে চলমান লতার কণ্ঠে গাওয়া গান মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনতে থাকেন। সাক্ষাৎকারগ্রহিতার কাছ থেকে এমন তথ্য পাওয়ার পর লতা একবাক্যে বলেছিলেন, ‘যদি এটা হয়ে থাকে, তাহলে তা খুবই ভালো হবে।’

ভারতের মধ্যপ্রদেশের ইনদোরের এক সংগীত পরিবারে ১৯২৯ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণ করেন লতা মঙ্গেশকর। তার বাবা পন্ডিত দীননাথ মঙ্গেশকর ছিলেন মারাঠি গানের দুনিয়ার প্রসিদ্ধ ধ্রুপদী গায়ক। বাবার কাছ থেকেই লতা পেয়েছিলেন গানের প্রথম তালিম। একটি চলচ্চিত্রের জন্য মাত্র ১৩ বছর বয়সেই প্রথমবারের মতো তার গান রেকর্ড করা হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত চলচ্চিত্র থেকে বাদ পড়েছিল তার গানটি।

১৯৪৫ সালে মুম্বাইয়ে পাড়ি জমান লতা। এরপর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে। সুদীর্ঘ সংগীত ক্যারিয়ারে হাজারের বেশি চলচ্চিত্রে গান করেছেন লতা। ভারতের ৩৬টি আঞ্চলিক ভাষার পাশাপাশি বিদেশি ভাষাতেও তিনি গান করেছেন। ভারতের সর্বকালের সেরা সংগীত শিল্পীদের একজন হিসেবে তাকে বিবেচনা করা হয়।

উল্লেখ্য, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শেষে স্বাধীন বাংলাদেশে এসে নানা জায়গায় গান পরিবেশন করেছিলেন লতা মঙ্গেশকর। পরবর্তীতে তিনি বাংলাদেশের চলচ্চিত্রেও গান গেয়েছেন। ১৯৭২ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত মমতাজ আলী পরিচালিত ‘রক্তাক্ত বাংলা’ নামে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্রে প্রখ্যাত সংগীত পরিচালক সলিল চৌধুরীর সুরে ‘ও দাদাভাই’ গানটি গেয়েছিলেন লতা মঙ্গেশকর। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে লতা মঙ্গেশকরের গাওয়া এটিই একমাত্র ও শেষ গান।

Get in Touch

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Related Articles

অভিবাসীর সঙ্গে থাকুন

10,504FansLike
2FollowersFollow
96SubscribersSubscribe

সাম্প্রতিক ঘটনা