সমুদ্রপথে ভয়ংকর যাত্রা: ‘ভেবেছিলাম আমরা সবাই মারা যাচ্ছি’

0
1154
সমুদ্রপথে-ভয়ংকর-যাত্রা
সমুদ্রপথে-ভয়ংকর-যাত্রা

২০২১ সালের অক্টোবরের ২৬ তারিখ, কয়েক ডজন অভিবাসন প্রত্যাশী সমুদ্রপথে লেবানন থেকে ইতালির উদ্দেশে রওয়ানা দেয়, কিন্তু তারা কখনোই তাদের গন্তব্যে পৌঁছতে পারেনি।

লেবাননের উপকূলীয় শহর আল-মিনারের একজন স্বর্ণকার আহমদ। লেবাননে ঘটে চলা দীর্ঘ বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে তার কারখানার পড়ে থাকা যন্ত্রপাতিগুলি আর চালাতে পারছিলেন না। তিনি তখন ভাবলেন যে, একটি উপায় খুঁজে বের করার সময় এসেছে।

‘আমি আমার সমস্ত সরঞ্জাম বিক্রি করে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম’, লেবাননের ২৫বছর বয়সী আহমদ সংবাদ মাধ্যম আল জাজিরাকে এমনটাই বলছিলেন। তার কয়েকজন বন্ধু উত্তরের শহর ত্রিপোলি থেকে বিপদজনক পথ পাড়ি দিয়ে নৌকায় করে ইতালি পৌঁছেছিল। তারা তাকে একই কাজ করতে রাজি করান।

দেশটির জনসংখ্যার তিন-চতুর্থাংশ দারিদ্যের মধ্যে বসবাস করছে, তীব্র জ্বালানি সংকটে বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলি বন্ধ হয়ে গেছে এবং লেবাননের মুদ্রার মূল্যমান তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে।

আহমেদ বলেন, তিনি ৮২ জন লেবানিজ ও সিরিয়ানদের মধ্যে ছিলেন যারা গত বছরের ২৬শে অক্টোবর মাছ ধরার নৌকায় উঠেছিলেন এবং বহুদূরে সমুদ্রে যাত্রা করেছিলেন। কিন্তু দলটি তার গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেনি।

সংবাদ মাধ্যম আল জাজিরা এমনই তিনজন যাত্রীর সঙ্গে কথা বলেছে, নিরাপত্তার স্বর্থে যাদের পুরো নাম গোপন রাখা হয়েছে।

তারা অবৈধ পুশব্যাক এবং নির্বিচারে আটক হওয়ার প্রক্রিয়া বর্ণনা করেছেন। যেটিকে মানবাধিকার সংস্থাগুলি অভিবাসীদের ইউরোপ থেকে দূরে রাখার একটি ক্রমবর্ধমান সাধারণ হাতিয়ার হিসাবে বর্ণনা করে আসছে।

লেবানন থেকে যাত্রা

কোন চোরাকারবারী এই ভ্রমণ পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িত ছিল না। নৌকা এবং খাবার সরবরাহের জন্য পরিবারগুলি তাদের জিনিসপত্র বিক্রি করেছে কিংবা টাকা ধার করেছে।

আহমেদ বলেন, ‘আমরা সবাই একই এলাকার বন্ধু, আত্মীয় এবং প্রতিবেশী ছিলাম।’

৩৬ বছর বয়সী আমানি, আল-মিনায় তার পুরো জীবন কাটিয়েছেন। তিনি কখনই ভাবেননি যে, তিনি তার তিন সন্তানকে একটি ‘মর্যাদাপূর্ণ জীবন’ দেওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে একদিন তার বাড়ি এবং গহনা বিক্রি করবেন।

তিনি আল জাজিরাকে বলেছেন,‘আমার ছেলে অসুস্থ হয়েছিল এবং তার জন্য কোনো ওষুধ কিনতে পারছিলাম না। এরপর আমি দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম।’

বিলাল, ইদলিবে বসবাসকারী একজন ৪৩ বছর বয়সী সিরিয়ান, প্রায় তিন দশক ধরে লেবাননে বসবাস করেছেন তিনি। তিনি একটি ক্যাফে এবং একটি আইসক্রিমের দোকানে কাজ করেছেন এবং একজন লেবানিজ নারীকে বিয়ে করেছেন।

‘আমি পর্যাপ্ত অর্থ উপার্জনের জন্য দিনে ১৮ ঘন্টা পর্যন্ত কাজ করেছি,’ তিনি বলেছিলেন। মুদ্রাস্ফীতির শেষ নিয়ে কোনো কুলকিনারা পাচ্ছিলেন না এবং রোজগার বাড়াতে না পেরে তিনি তার গাড়ি, তার স্ত্রীর গহনা – এমনকি তার মেয়ের কানের দুল পর্যন্ত বিক্রি করে সকলের মঙ্গলের জন্য দেশ ছেড়ে চলে যাবার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

দলটি ২৬ অক্টোবর যাত্রা শুরু করে। কিন্তু ঝড়ের কারণে ইঞ্জিন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর তিন দিন সমুদ্রে ভেসে বেড়ায়।

তারা নৌকায় করে গ্রীক দ্বীপ কাস্তেলোরিজোতে ভেড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। ‘আমরা কোস্টগার্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করে অনুমতি চেয়েছিলাম,’ আমানি বলছিলেন। ‘তখন তারা আমাদের স্বাগত জানিয়েছিল, এমনকি তারা আমাদের আর কোনো সাহায্য লাগবে কিনা সে বিষয়েও জানতে চেয়েছিল।’

আরো পড়ুনভূমধ্যসাগরের ঢেউয়ে বিলীন অজস্র জীবনইউরোপে মানব পাচারে ভিন্ন কৌশল, ব্যবহৃত হচ্ছে প্রমোদতরী

গ্রিক কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে নিপীড়নের অভিযোগ

কয়েক মিনিট পরে, একটি হেলেনিক কোস্ট গার্ড জাহাজে করে তাদের নৌকার কাছে চলে আসে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুসারে, কর্মকর্তারা তাদের মুখ লুকানোর জন্য কালো মুখোশ পরেছিলেন।

আমানি বলেন, ‘তারা একটা বড় বেলুনের মতো কিছু দেখায় এবং আমাদের নৌকাটির সঙ্গে তাদের জাহাজ লাগিয়ে দেয়। তারপর, তারা আমাদের জাহাজে উঠার নির্দেশ দিল।’

একজন যাত্রী, যিনি গ্রীক অফিসারদের সঙ্গে ইংরেজিতে কথা বলছিলেন, তিনি জাহাজে উঠতে অস্বীকার করেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, তাকে মারধর করা হয় এবং জোর করে জাহাজে তুলে নেওয়া হয়।

বাকি যাত্রীদের ভয় দেখানোর জন্য কোস্টগার্ড ফাঁকা গুলি চালায়। ‘তারপর তারা আমাদের ফোন, টাকা, জামাকাপড় এবং ব্যাগ নিয়ে যায়,’ বিলাল বলেন।

ভিজে যাওয়া যাত্রী, মহিলা ও শিশুদেরকে ঘরের ভেতর বসতে দেয়ার জন্য কর্মকর্তাদের কাছে অনুরোধ করা হয়। ‘তবে আমাদের একটি খুব ছোট ঘরে আরো ঠান্ডা তাপমাত্রায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল,’ আমানি বলেন। তাদের কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে জানতে চাইলে লাঠিসোটা দিয়ে মারধর করা হয়।

তবে গ্রীক মিনিস্ট্রি অফ মেরিটাইম অ্যাফেয়ার্স এবং ইনসুলার পলিসি এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তারা বলছে যে, তারা যেটা করেছেন তা আন্তর্জাতিক আইনি বাধ্যবাধকতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ এবং অভিবাসীদের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগের ঘটনাকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে।

গ্রিক মন্ত্রণালয় আল জাজিরাকে এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ‘আমাদের অবশ্যই জোর দিতে হবে যে, গ্রীক কর্তৃপক্ষের অপারেশন অনুশীলনে কখনই এই জাতীয় ক্রিয়াকলাপ অন্তর্ভুক্ত ছিল না।’

‘ইতালি এই পথে’

কোস্টগার্ডের জাহাজে এক রাত কাটানোর পর যাত্রীদের চারটি লাইফ র‌্যাফ্টে (জরুরি পরিস্থিতি ব্যবহৃত এক ধরনের ছোট যান) ভাগ করে ওঠানো হয়েছিল। ‘প্রতিটি লাইফ র‌্যাফ্টের মধ্যে ২০-২৫ জন লোক ছিল, অথচ যা কিনা মাত্র এক ডজন লোকের জন্য উপযুক্ত,’ আহমেদ বলেছিলেন। ‘কর্মকর্তারা বললেন ‘ইতালি এই পথে’ এবং তারা চলে গেল।’

কয়েকজনকে তাদের জিনিসপত্র ফেরত দেওয়া হয়, অন্যরা তাদের পকেটে যা ছিল তা রেখে গিয়েছিল। ‘এক ব্যক্তি তার ফোন ফেরত দেয়ার কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে প্রহরী তাকে লাইফ র‌্যাফ্টে উঠতে বলে এবং না উঠলে তারা তাকে মারধর করবে বলে হুমকি দিয়েছিল।’ আমানি বলতে থাকেন।

দলটি অনুমান করেছে যে তারা সকাল ৫টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত ভেসে ছিল। আমানি বলেন, ‘যাত্রীরা তাদের হাত দিয়ে প্যাডেল চালাচ্ছিল, বাচ্চারা চিৎকার করছিল এবং কাঁদছিল এবং আমরা সবাই ভেবেছিলাম আমরা মারা যাচ্ছি,’ আমানি বলেছিলেন।

যাত্রীদের মধ্যে একজন যার কাছে ফোন ছিল, তিনি একটি জরুরি নম্বরে কল করেছিলেন। কলটি কেউ রিসিভ করল, কিন্তু ইতালীয় কর্তৃপক্ষ নয়।

‘তুর্কিরা উত্তর দিয়েছিল এবং আমাদের বলেছিল যে আমরা ইজমিরের কাছে তাদের জলসীমায় ছিলাম,’ বিলাল বলেছিলেন। ‘প্রায় চার ঘন্টা পরে, একটি তুর্কি উদ্ধারকারী জাহাজ এলো।’

মূলত, ইউরোপীয় কমিশন গ্রীসকে তার সীমান্তে অভিবাসীদের এড়াতে এবং পুশব্যাক পর্যবেক্ষণ একটি স্বাধীন ব্যবস্থা স্থাপন করতে বলেছে।

আয়ারল্যান্ডের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, আইরিশ সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটসের পিএইচডি গবেষক নিয়াম কেডি-তাব্বাল, গালওয়ে আল জাজিরাকে বলেছেন যে এটি একটি ‘সম্মিলিত বহিষ্কারের পদ্ধতিগত নীতি’, যেখানে কোস্টগার্ড সাধারণত অভিবাসী জাহাজগুলিকে নিষ্ক্রিয় করে এবং কখনও কখনও সনাক্তকরণের নথি, অর্থ বাজেয়াপ্ত করে এবং ব্যক্তিগত জিনিসপত্রও।’

কেডি-তাব্বাল বলেন, ‘তাদেরকে সাধারণত আন্তর্জাতিক ও ইউরোপীয় আইন লঙ্ঘন করে লাইফ র‌্যাফ্টে উঠতে বাধ্য করা হয় এবং তুরস্কের দিকে পুশব্যাক করা হয়।’

২০২০ সালের মার্চ থেকে, জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) ক্রমবর্ধমানভাবে স্থল এবং সমুদ্র উভয় ক্ষেত্রেই কথিত পুশব্যাক সম্পর্কে রিপোর্ট পাচ্ছে।

এই সপ্তাহের শুরুতে, আল জাজিরা অভিযোগ করেছে যে, অন্তত ৩০ জন কিউবান, ইউরোপে আশ্রয় দাবি করার আশায়, গ্রীক কর্তৃপক্ষের দ্বারা অপব্যবহারের শিকার হয়েছিল এবং গত বছরের শেষের দিকে তাদেরকে স্থল সীমান্ত পেরিয়ে তুরস্কে জোরপূর্বক বহিষ্কার করা হয়েছিল।

তুরস্কে আটক

তুর্কি কর্তৃপক্ষ ক্লান্ত পরিবারগুলিকে দক্ষিণ-পশ্চিম তুরস্কের আয়দিনে ইইউ এর সহায়তায় পরিচালিত একটি অপসারণ কেন্দ্রে নিয়ে যায়, যেখানে তাদের প্রায় এক মাস ধরে ২৮ নভেম্বর পর্যন্ত রাখা হয়েছিল।

তুরস্কে বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম অভিবাসন-সম্পর্কিত আটক কেন্দ্রের ব্যবস্থা রয়েছে। ২৫ টি অপসারণ কেন্দ্র পরিচালনা করছে দেশটি, যার ধারণক্ষমতা প্রায় ১৬ হাজার। পাশাপাশি তাদের সীমান্তে অ্যাডহক আটক স্থান, বিমানবন্দর ট্রানজিট জোন এবং পুলিশ স্টেশনে আটককেন্দ্র রয়েছে।

জেনেভা-ভিত্তিক গবেষণা কেন্দ্র গ্লোবাল ডিটেনশন প্রজেক্ট অনুসারে ২০১৬ সালের‘ ইইউ-তুরস্কের শরণার্থী চুক্তি’টি ইইউ এর অর্থায়নে তুরস্কের অভিবাসী অপসারণ ব্যবস্থাকে প্রসারিত করেছে, যার ফলে শরণার্থী এবং আশ্রয়প্রার্থীদের আটক এবং সংক্ষিপ্ত বিতাড়ন বৃদ্ধি পেয়েছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলিতে ৮৭ মিলিয়ন ইউরো এরও বেশি ইইউ তহবিল তুরস্কে আটটি অপসারণ কেন্দ্র নির্মাণ এবং ১১টি কেন্দ্র সংস্কারের জন্য অর্থ প্রদান করেছে।

ইইউ কমিশনের একজন মুখপাত্র আল জাজিরাকে বলেছেন, ‘অপসারণ কেন্দ্রগুলিতে ইইউ সমর্থনের উদ্দেশ্য হল- অভিবাসীদের গ্রহণ করার পদ্ধতিকে উন্নত করা এবং আন্তর্জাতিক সুরক্ষা আইনের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে তুরস্কে এই অপসারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’

সূত্র: আল জাজিরা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here