বৃহস্পতিবার, 22 ফেব্রুয়ারি, 2024

কতদিন অনুপস্থিত থাকলে ইইউভূক্ত দেশে দীর্ঘমেয়াদী বাসিন্দার মর্যাদা হারাতে হয়?

একটানা কতদিন অনুপস্থিত থাকলে অ-ইউরোপীয় দেশ থেকে আসা নাগরিকদের ইউরোপীয় ইউনিয়নভূক্ত দেশসমূহে দীর্ঘ মেয়াদী বাসিন্দার মর্যাদা হারাতে হয়? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতে অনেকেই হয়তো দিশেহারা হয়েছেন। আসলে প্রশ্নটির সরল কোনো উত্তর কারোই জানা ছিল না এতদিন। সম্প্রতি এ বিষয়ে একটি উত্তর পাওয়া গেছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কোর্ট অব জাস্টিস এর পক্ষ থেকে।

কোর্ট অব জাস্টিস এর বিচারকরা জানিয়েছেন যে, অ-ইউরোপীয় দেশগুলোর নাগরিকদের দীর্ঘমেয়াদী বাসিন্দার মর্যাদার হারাতে হবে না, যদি কেউ ১২ মাসের মধ্যে কয়েক দিন শারীরিকভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়নভূক্ত দেশসমূহে উপস্থিত থাকেন। বিচারকরা নির্দিষ্ট করে বলেছেন, এখন থেকে একবার যদি কারো দীর্ঘমেয়াদী বাসস্থান অর্জিত হয় এবং কেউ যদি মাত্র কয়েক দিনও উপস্থিত থাকে, তাহলে ‘তাকে নিয়মিতভাবে তার বাসস্থানে থাকতে হবে না।’

আদালতে এ বিষয়টি ওঠার প্রেক্ষাপট কী?

২০১৬ সালে কার্যকর হওয়া ইউরোপীয় ইউনিয়নে নির্দেশনার অধীনে, বাইরের দেশের নাগরিকরা ইউরোপিয় ইউনিয়নভূক্ত যেকোনো একটি দেশে নিরবিচ্ছিন্নভাবে পাঁচ বছরের জন্য বৈধভাবে বসবাস করার পর দীর্ঘমেয়াদী আবাসিক অবস্থানের জন্য আবেদন করতে পারেন।

এই মর্যাদা পেতে কিছু নির্দিষ্ট শর্ত জুড়ে দেয়া হয়-তাদের আয় রোজগারের ক্ষেত্রে ধারাবাহিক স্থিতিশীলতা থাকতে হবে এবং নিজেদের ও পরিবারের সদস্যদের চাহিদা মেটানোর ক্ষেত্রে সামাজিক সহায়তার ওপর নির্ভর করা যাবে না, অবশ্যই স্বাস্থ্য বিমা থাকতে হবে এবং প্রয়োজন হলে জাতীয় পর্যায়ে ভাষা ও দেশীয় মৌলিক নীতিগুলি জানা সাপেক্ষে তাদের প্রমাণ করতে হবে যে, তারা সমাজের অংশীভূত। এ বিষয়গুলো অর্জিত হলে দীর্ঘমেয়াদী বাসস্থান, শিক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা ও অন্যান্য কল্যাণমূলক সুবিধার ক্ষেত্রে ইইউ নাগরিকদের মতোই অধিকার প্রদান করা হয় তাদের।

তবে যদি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি টানা ১২ মাস ইইউ এর বাইরে অবস্থান করে, তাহলে তার স্থায়ী বসবাসের অনুমোদনটি বাতিল হতে পারে (অবশ্য এক্ষেত্রে ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি বিবেচনা করে ইইউ দেশগুলি কাউকে কাউকে দীর্ঘ সময়ের অনুমতি দিতে পারে)।

এই স্পষ্ট ব্যাখ্যার কেনো প্রয়োজন পড়লো?

অস্ট্রিয়ায় বসবাসরত একজন কাজাখ নাগরিকের সঙ্গে এই বিষয়টি সম্পৃক্ত। এ ব্যক্তির পক্ষ থেকে দীর্ঘ মেয়াদে বসবাসের অনুমতিপত্র নবায়নের আবেদন করা হলে ভিয়েনা প্রদেশের সরকার প্রধান তা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। যুক্তি হিসেবে বলা হয়, বিগত পাঁচ বছরের মধ্যে মাত্র কয়েকদিনের জন্য এই কাজাখ নাগরিককে ইইউ অঞ্চলে দেখা গিয়েছিল। এরপর সেই ব্যক্তি স্থানীয় প্রশাসনিক আদালতে এই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ জানান এবং ইইউ এর বিচারিক আদালতে নিয়মগুলি ব্যাখ্যার অনুরোধ করেন।
এরপর প্রশাসনিক আদালত ইইউ আদালতকে পরিস্কার করতে বলে যে, কেউ যদি শারীরিকভাবে মাত্র কয়েক দিনের জন্যও উপস্থিত থাকে, তাহলে তার দীর্ঘমেয়াদী বাসিন্দার মর্যাদা হারানোর বিষয়টি রোধ করা হবে কিনা। এক্ষেত্রে ইইউ সদস্য রাষ্ট্রগুলো অতিরিক্ত আরো কোনো শর্ত আরোপ করতে পারে।

রায়ে যা বলা হয়েছিল

ইউ কোর্ট অব জাস্টিস চলতি সপ্তাহে রায় দিয়েছে, ‘দীর্ঘমেয়াদী আবাসিক অবস্থানের ঝুঁকি রোধ করতে’ অনুপস্থিতি শুরু হওয়ার পর ১২ মাসের মধ্যে কয়েক দিনের জন্য ইইউতে উপস্থিত থাকা যথেষ্ট।
আদালত কর্তৃক নির্দেশের এই ব্যাখ্যাটি এখন থেকে ইইউ এর জাতীয় প্রশাসন এবং আদালতগুলিকে অনুসরণ করতে হবে (ডেনমার্ক ও আয়ারল্যান্ড ব্যতিত)।

ইইউ বিচারকরা উল্লেখ করেছেন যে, নির্দেশটি ‘তৃতীয় দেশের নাগরিকদের একীকরণে নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে’। এছাড়া যেহেতু তারা প্রমাণ করতে পেরেছে যে, তারা সেই সদস্য রাষ্ট্রে বসবাস করেছে’ সেহেতু তারা নীতিগতভাবে ইইউ নাগরিকদের মতোই সুবিধাপ্রাপ্ত হবেন। তারাও ইউরোপীয় ইউনিয়নভূক্ত দেশসমূহের বাইরে দীর্ঘ সময়ে জন্য ভ্রমণ ও বসবাস করতে পারে কোনো রকম মর্যাদা না হারিয়েই। তবে যারা ১২ মাসের বেশি সময় ধরে টানা অনুপস্থিত থাকবে তাদের ক্ষেত্রে এই এই নির্দেশটি প্রযোজ্য হবে না।
ইংল্যান্ডের এসেক্স ইউনিভার্সিটির ইইউ আইন, মানবাধিকার ও বিশ্ব বাণিজ্য আইনের অধ্যাপক স্টি পিয়ার্স বলেছেন, ‘অনুপস্থিতির কারণে মর্যাদা হারানোর এই বিষয়টি নিয়ে এটিই প্রথম রায়।’

ইইউ স্ট্যাটাস হারানোর অর্থ জাতীয় বাসস্থান হারানো নয়

অধ্যাপক পিয়ার্স আরো ব্যাখ্যা করেছেন যে, যখন কোনো ব্যক্তি ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতে দীর্ঘমেয়াদী বসবাসের মর্যাদা হারায় তখনও তার জাতীয় মর্যাদা বজায় রাখা সম্ভব।

ইইউ পরিসংখ্যান অফিস ইউরোস্ট্যাট অনুসরারে, ইউরোপীয় ইউনিয়নে বসবাসকারী ২৩ মিলিয়ন অ-ইইউরোপীয় নাগরিকদের মধ্যে ১০ মিলিয়নেরও বেশি ২০১৯ সালে দীর্ঘ মেয়াদে বসবাস করেছিল।

এই বাসিন্দারা যে দেশে বসবাস করেন সেই দেশে নাগরিকত্ব অর্জনের পাশাপাশি তারা শিক্ষা ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ, সামাজিক নিরাপত্তা, কর সুবিধা ও আবাসন পাওয়ার পদ্ধতিতে প্রবেশের অধিকার পেয়েছেন’-বলেন স্পেনে আলজেসিরাসের ইংরেজি-ভাষী বিদেশীদের অধিকার বিষয়ক আইনি প্রতিষ্ঠানের বিশেষজ্ঞ মারিয়া লুইসা কাস্ত্রো কোষ্টালুজ।

Get in Touch

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Related Articles

অভিবাসীর সঙ্গে থাকুন

10,504FansLike
2FollowersFollow
97SubscribersSubscribe

সাম্প্রতিক ঘটনা