বৃহস্পতিবার, 30 মে, 2024

কাতারে যাওয়ার আগে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জেনে নিন

নানাবিধ বাস্তবতাকে সঙ্গী করে জীবিকার উদ্দেশ্যে জীবনের প্রথমবারের মতো মধ্যপ্রাচ্যের দেশ কাতারে পা রেখেছিলাম। দেশটিতে এসে নিজ চোখে অবলোকনের সুযোগ পেয়েছি যে, এখানে বসবাসরত হাজারো প্রবাসী কীভাবে জীবন যাপন করে, জীবিকার জন্য লড়াই করে। কাতারে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে এসব বিষয় জানা জরুরি। আমার বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে পাঠকের সামনে কিছু পরামর্শ তুলে ধরছি।

গ্রীস্মকালে গড়ে ৪৫-৫২ ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রার মধ্যে তাদের কাজ করতে হয়

ভৌগলিক আয়তনের দিক থেকে কাতার পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের ছোট একটি দেশ। কাতারের দক্ষিণে সৌদি আরব ও পশ্চিমে দ্বীপ রাষ্ট্র বাহরাইন। দেশটির আয়তন মোটের ওপর ১১ হাজার ৫৮১ কিলোমিটার। কিন্তু তারপরও এর অর্থনৈতিক ভিত অন্যান্য অনেক দেশের চেয়ে যথেষ্ঠ মজবুত। এর প্রধান কারণ দেশটিতে খনিজ তেল ও প্রাকৃতিক সম্পদেও বড় মজুদ আছে।

ব্রিটিশ শাসনের হাত থেকে মুক্ত হওয়ার পর ৭০ এর দশকে পেট্রোলিয়ামের মজুদ আবিস্কৃত হওয়ার পর দেশটির অর্থনীতি দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়ায়। বর্তমানে মাথাপিছু আয়ের হিসাবে কাতার বিশ্বের সবচেয়ে ধনী দেশ। অর্থনৈতিকভাবে দারুণভাবে এগিয়ে থাকা দেশটির উন্নয়নে প্রচুরসংখ্যক বিদেশি শ্রমিকের অবদান রয়েছে। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, নেপাল, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও মিশরসহ স্বল্পোন্নত বিভিন্ন দেশের শ্রমিক দেশটিতে কাজ করে। আর এই বিপুলসংখ্যক শ্রমিকদের বেশীরভাগই নির্মাণ খাত সংশ্লিষ্ট কাজে যুক্ত রয়েছে।

আমি আমার বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে প্রত্যক্ষ করেছি কাতারে কর্মরত বিদেশি শ্রমিকরা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণভাবে কাজ করে। প্রচন্ড ঝুঁকির মধ্য দিয়ে নিরাপত্তার ও দক্ষতার সঙ্গে কাজ করার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যায়। শুনতে অবাক লাগলেও একথা সত্যি যে, গ্রীস্মকালে গড়ে ৪৫-৫২ ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রার মধ্যে তাদের কাজ করতে হয়। যদিও প্রচন্ড গরমের সময় দিনের চাপ এড়াতে রাতে কাজ চলে।

উল্লেখ্য যে, চলতি বছর বিশ্বকাপ ফুটবল প্রতিযোগিতার ২২তম আসর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে কাতারে। এ লক্ষ্যে পুরো দেশের অবকাঠামোগত পরিবর্তনে বিস্তর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে কাতার সরকার। এর মধ্যেও সেই নির্মাণ খাত একটা চ্যালেঞ্জিং ব্যাপার। এ খাতে বাংলাদেশসহ আরো অনেক দেশের হাজার হাজার শ্রমিক কাজ করছে এখানে।

কাতরের ফ্রি ভিসা ও সাপ্লাই ভিসা কী

বাংলাদেশি শ্রমিকরা সাধারণত কয়েকটি ক্যাটাগরিতে কাতারে গিয়ে থাকে। এর বেশিরভাগই হলো ফ্রি ভিসা ও সাপ্লাই কোম্পানির ভিসা। আসলে ফ্রি ভিসা বলে কিছু নেই। ফ্রি ভিসার বিষয়টি হলো, আপনি যেকোন মালিকের অধীনে কাজ করতে পারবেন। অন্যদিকে সাপ্লাই কোম্পানির ভিসা বলতে বোঝায়, একজন কর্মীকে তারা তাদের অর্থায়নে ভিসা দিয়ে নিয়ে আসে এবং তাদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ থাকতে হবে। চুক্তিবদ্ধ শ্রমিক চুক্তিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান ছাড়া নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে পারবে না।

বলা বাহুল্য বাংলাদেশের রিক্রটিং এজেন্সিগুলো এক্ষেত্রে অনেক টাকা নেয় কিন্তু বাস্তবতা হলো সাপ্লাই কোম্পানির ভিসা পেতে এত টাকা লাগে না। ফ্রি ভিসা ও সাপ্লাই ভিসার কিছু অসুবিধা রয়েছে। এর মধ্যে ফ্রি ভিসার একটি সমস্যা হলো, যখন কাজের সংকট দেখা দেয়, তখন নিজ খরচে থাকা খাওয়ার ব্যয় বহন করতে হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে যা একজন শ্রমিকের জন্য বেশ কষ্টসাধ্য ব্যাপার।

আবার সুবিধা হলো দেশের শ্রমিক সংকট হলে তখন ভালো মজুরি পাওয়া যায়। আর সাপ্লাই ভিসার অসুবিধা হলো, শ্রমিক নিয়োগের ক্ষেত্রে অনেক সাপ্লাই কোম্পানি ন্যায্য পারিশ্রমিক না দিয়ে অনেক অল্প টাকা মজুরি দিয়ে থাকে। যদিও আহার, বাসস্থান, মেডিকেল, ইকামাসহ অন্যান্য সুযোগ সুবিধা দিয়ে থাকে তারা।

তবে সুখবর হলো, শ্রমিকদের নানাবিধ সমস্যা উপলব্ধি করে পরবর্তী সময়ে কাতার সরকার প্রত্যেক প্রবাসীর জন্য কিছু নীতিমালা শিথিল করে থাকে। এর মধ্যে অন্যতম হলো, ফ্রি ভিসা ব্যতীত সব কোম্পানিতে নিয়োগরত শ্রমিকদের সর্বনিন্ম বেতন ১ হাজার রিয়াল (বাংলাদেশি টাকায় ২৩ হাজার টাকা প্রায়) নির্ধারণ করা হয়। এছাড়া চাইলে শ্রমিক কোম্পানি পরিবর্তন করতে পারবে।

যদিও অনেক কোম্পানি সহজেই এই অনাপত্তিপত্র দিতে চায় না। এ কারণে অনেক শ্রমিক কোম্পানি ছেড়ে গেলে তারা ‘অবৈধ’ বলে বিবেচিত হয় এবং তাদের কেউ কেউ অধিক রোজগারের জন্য অবৈধ পথে পা বাড়ায়। এরকম পরিস্থিতি উত্তরণে একপর্যায়ে কাতার সরকার অবৈধ প্রবাসী শ্রমিকদের বৈধ হবার সুযোগ করে দেয়। এতে করে বাংলাদেশি প্রবাসী ভাইয়েরা অনেক খুশি ও দুঃশ্চিন্তা মুক্ত হয়।

বিদেশ আসার আগে যে প্রশ্নগুলোর উত্তর জানা প্রয়োজন

মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কাতার থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রেমিট্যান্স পাচ্ছে বাংলাদেশ। এখানে কাজ করে হাজার হাজার বাংলাদেশি শ্রমিক নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তন করতে সক্ষম হয়েছে। ভাগ্য পরিবর্তনের যারা স্বপ্ন দেখছেন এবং জীবিকার উদ্দেশ্যে যারা কাতার বা অন্যান্য দেশে আসতে চান, তারা সবার আগে নিজেকে এই প্রশ্নগুলি বারবার করুন-

  • আমি যে বিদেশ যেতে চাই, আমি কী কোন কাজে দক্ষ?
  • রিক্রুটিং এজেন্সি কী পরিমাণ টাকা নিচ্ছে?
  • আমি কি সঠিক ভিসা পেয়েছি?
  • আমার বেতন কত হবে?
  • আমি যে এত টাকা খরচ করে বিদেশে যেতে চাচ্ছি তা কতটুকু যুক্তিযুক্ত?
  • আমি কী সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছি?

প্রতিটি প্রশ্নের সঠিক উত্তর পাওয়ার পরই বিদেশে যাওয়ার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। অন্যথায়, প্রশ্নগুলোর কোনটি নিয়ে যদি সন্দেহ তৈরি হয় তাহলে তা পরিস্কার হোন। কারণ প্রবাসে অবস্থানরত শ্রমিকদের ৯৫ শতাংশ মানুষকে আপাত দৃষ্টিতে সফল মনে হলেও, তাদের কিন্তু সমস্যার অন্ত নেই, হয়তো তারা সেটি প্রকাশ করে না।

লেখক: রোমানিয়ায় অবস্থানরত বাংলাদেশি প্রবাসী।

Get in Touch

  1. আশা করি আপনার এই কথাগুলো যারা দেশ ছেড়ে প্রবাসে যেতে ইচ্ছুক তাদের অনেক উপকারে আসবে। আমাদের বাংলাদেশের অনেক ভাই প্রবাসে যাওয়ার আসায় না জেনে দালালের কথায় পা বাড়িয়ে ফাঁদে পড়ে যায়। তাই আমরা যারা প্রবাসে থাকি তাদের সবারই উচিত আমাদের বাংলাদেশি ভাইদের অন্য কোনো ভাবে সাহায্য করতে পারি বা না পারিএকটু সতর্ক করে দেওয়া।যাতে করে তারা কোনো ধরনের ফাঁদে না পরে।

    #শফিকুল ইসলাম বাবু# ভাই আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ আমাদের সবার সামনে এই মূল্যবান কথাগুলো তুলে ধরার জন্য।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Related Articles

অভিবাসীর সঙ্গে থাকুন

10,504FansLike
2FollowersFollow
97SubscribersSubscribe

সাম্প্রতিক ঘটনা