শনিবার, 20 জুলাই, 2024

ফ্রান্সের নতুন প্রধানমন্ত্রী একজন রাষ্ট্রহীন পিতার সন্তান

ফ্রান্সের নতুন প্রধানমন্ত্রী এলিজাবেথ বোর্নের শৈশব ১৯৭২ সালে তার বাবার আত্মহত্যার দ্বারাই নির্ধারিত হয়েছিলো। তখন এলিজাবেথ বোর্নের বয়স ছিলো মাত্র ১১ বছর। তার বাবা জোসেফ বোর্ন; প্রকৃত নাম বোর্নস্টেইন। যিনি ছিলেন পোলিশ বংশোদ্ভূত ইহুদি প্রতিরোধ যোদ্ধা। তিনি উশউইটজের নরক থেকে বেঁচে গেলেও সেই অভিজ্ঞতাকে একদিনের জন্যও ভুলতে পারেননি।

প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাঁখো যখন এলিজাবেথ বোর্নকে ফ্রান্সের নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন, তখন ফরাসিরা ৬১ বছর বয়সী বোর্নের পারিবারিক পটভূমি সম্পর্কে খুব বেশি জানতো না।

গত তিন দশকের মধ্যে ফ্রান্সের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এলিজাবেথ বোর্ন তার পারিবারিক এবং ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে বিবেচক ছিলেন। যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা দেখেই বোঝা যায়।

এলিজাবেথ বোর্নের বাবা জোসেফকে ১৯৯৪ সালে উশউইটস বিরকেনাউ কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে নির্বাসিত করা হয়েছিলো। একবছর পর তাকে সেখান থেকে মুক্তি দেওয়া হলেও উশউইটস নৃশংসতা, প্রিয়জনদের হারানোর মতো তিক্ত স্মৃতি তাকে সবসময় তাড়িত করতে থাকে। ফলে তিনি তার মেয়ে এলিজাবেথ বোর্নের যখন ১১ বছর বয়স, তখন আত্মহত্যা করেন।

আরো পড়ুন:

‘রাষ্ট্রহীন’ মানুষদের সঙ্গে কেনো এত অন্যায্য আচরণ করা হয়

২০২১ সালে ‘সিএইট’ নামের ফরাসি চ্যানেলে একটি সাক্ষাৎকারে এলিজাবেথ বলেন, ‘এটি আমার জন্য মেনে নেওয়া সহজ ছিলো না। কারণ খুব অল্প বয়সে আমাকে বাবাকে হারাতে হয়েছে। আমরা পরে আর মায়ের সঙ্গে থাকিনি। কারণ তারও দুই মেয়ে ছিলো এবং তাদের আয়ও খুব বেশি ছিলো না।’

বোর্ন পোল্যান্ডে তার শিকড় খুঁজে পেয়েছিলেন। তার দাদা জেলিগ বোর্নস্টেইন দুই ছেলের সঙ্গে শিবিরেই মারা যান। ১৯২০ এর দশকে তারা বেলজিয়ামে ইহুদি বিরোধীতা থেকে পালিয়ে যান। এবং সেখানে একজন হীরা ব্যবসায়ীর সঙ্গে কাজ শুরু করেন। জোসেফ ১৯২৫ সালে অ্যান্টওয়ার্পে বোর্নস্টেইন পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তারা ছিলেন চার ভাই। বাকি তিনজন লিওন (১৯২১ সালে), আইজ্যাক (১৯২৩ সালে) এবং অ্যালবার্ট ১৯৩০ সালে জন্মগ্রহণ করেন।

যখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়, তখন পরিবারটিকে আবারও নির্বাসনে যেতে বাধ্য করা হয়। ফলে তারা দক্ষিণ ফ্রান্সে পালিয়ে যায়। সেখানে তারা প্রথমে টুলুজ এরপর মন্টাউবান এবং নিমেসে আশ্রয় নেন। তাদের মা আনা ৩৬ বছর বয়সে মারা যান।

ফরাসি ইহুদি প্রতিরোধে যোগদান

১৯৪২ সালের অগাস্টে জোসেফ এবং তার ভাই আইজ্যাককে প্রথমবারের মতো রাষ্ট্রহীন ইহুদি হিসাবে গ্রেফতার করে। এবং দক্ষিণ ফ্রান্সের একটি ট্রাসজিট ও বন্দী কেন্দ্র ক্যাম্প ডি রিভসাল্টেসে নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো। ‘তারা তাদেরকে পালাতে সাহায্য করার জন্য জেলিগ রিভসাল্টেসে একজন প্রহরীকে ঘুষ দেয়। তারা ১৯৪২ সালের শেষের দিকে নিমেসে ফিরে আসে এবং প্রতিরোধে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন’, জ্যঁ-পল বোরে এএফএমডি এর ভাইস-প্রেসিডেন্ট ‘কুলতিয়া’ ওয়েবসাইটকে একথা জানান।

১৯৪৩ সালের ৬ মার্চ তার বড় ভাই লিওনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এবং তাকে কনভয় ৫১ এর সঙ্গে পূর্ব পোল্যান্ডের সোবিবোর নির্মূল ক্যাম্পে নির্বাসিত করা হয়েছিলো। যে তিনজন বেঁচে ছিলো, পরে তারা বোর্নস্টেইন পরিবারের নাম সংক্ষেপ করে বোর্ন রাখে এবং ফ্রান্সের প্রতিরোধে যোগ দেয়। ফরাসি সাপ্তাহিক লা পয়েন্ট অনুসারে, গ্রুপের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা আব্রাহাম পোলোনস্কির নেতৃত্বে ফরাসি ইহুদি প্রতিরোধে যোগদানের জন্য তাদের লক্ষ্য ছিলো পূর্ব ফরাসি শহর গ্রেনোবল থেকে পুরুষ ও মহিলাদেরকে দক্ষিণ টার্ন অঞ্চলের স্ক্রাবল্যান্ডে নিয়ে যাওয়া।

আরো পড়ুন:

দেশে দেশে রাষ্ট্রহীন মানুষ

কিন্তু ২৪ ডিসেম্বর, ১৯৪৩-এ জেলিগ এবং তার তিন ছেলে – জোসেফ, আইজ্যাক এবং অ্যালবার্ট – গ্রেনোবলের গেস্টাপো দ্বারা গ্রেফতার হন। তারা আইজাক রেকর্ড করা সাক্ষ্যে ফরাসি ইনস্টিটিউট ন্যাশনাল ডি ল’অডিওভিজুয়েলকে (আইএনএ) বলেছিলেন ‘আমাদের কাছে মিথ্যা কাগজপত্র ছিল, এবং পুলিশ যখন রাত ১০ টায় অ্যাপার্টমেন্টে ঢোকে, তারা আমাদের প্যান্ট নামিয়ে দেয়…তারা ইহুদিদের খুঁজছিল। তারা লোকেদের অন্যদের নিন্দা করার জন্য আগ্রহ দিচ্ছিলো। আমরা তার শিকারও হয়েছিলাম।’

‘তোমার বাবা-মা, যারা স্বর্গে যাবে’

২০ জানুয়ারী, ১৯৪৪-এ কনভয় ৬৬-এ উশউইটস-বারকেনাউতে নির্বাসিত হওয়ার আগে পরিবারটিকে প্যারিসের কাছে ড্রেন্সিতে স্থানান্তরিত করা হয়েছিল। সেখানে যেন তারা নরক আবিষ্কার করে। নাৎসি ক্যাম্পে বিভিন্ন ধরনের দায়িত্ব পালন করতে বাধ্য করা ইহুদি বন্দীদের সোন্ডারকমান্ডো দলগুলোর কথা উল্লেখ করে আইজ্যাক বলেন, ‘এসএস এবং সন্ডারকোমান্ডো লোকদের সারি ছিল। [‘আউট, আউট, আউট,’ জার্মান ভাষায়]। আমাদের দ্রুত বেরিয়ে আসতে হয়েছিল। ইতিমধ্যেই তুষারপাত হচ্ছিলো। এবং তখনই আমার ভাই জোসেফ এবং আমাকে কাজ করার জন্য নির্বাচিত করা হয়েছিলো। জেলিগ এবং অ্যালবার্টকে সরাসরি গ্যাস চেম্বারে নিয়ে যাওয়া হয়।

জোসেফ এবং আইজ্যাক বুনা-মনোভিটজ বা উশউইটস ওওও-এ কাজ করতে গিয়েছিলো। যা বিশাল কারাগার ব্যবস্থার তিনটি বড় ক্যাম্পের মধ্যে একটি। ‘যখন আমরা পৌঁছেছিলাম, ছাই বাতাসে উড়ছিলো। যখন বাতাস ছিলো এবং চিমনিগুলি জ্বলছিলো, তখন সর্বত্র দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছিলো। এবং প্রবীণরা, যারা শিবিরে ছিলেন, তারা আমাদের বললেন, ‘তোমরা দেখেছো যে, তোমার বাবা-মা কি স্বর্গে যাচ্ছে। তারা জ্বলছে।’

আইজ্যাকের মতে, এক বছরের জন্য, বোর্ন ভাইরা বিশেষভাবে, তাদের সংহতির মনোভাবের জন্য ধন্যবাদ যে, তারা বেঁচে থাকতে সক্ষম হয়েছিল। ‘আমরা সবসময় সবকিছু শেয়ার করতাম, সে আমার সঙ্গে এবং আমি তার সঙ্গে।’

এলিজাবেথ বোর্নের বাবা (বা থেকে প্রথম), ছবি: সংগৃহীত

১৯৪৫ সালের গোড়ার দিকে, সোভিয়েত রেড আর্মি পূর্ব থেকে অগ্রসর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে, বোর্ন ভাইদের আরও পশ্চিমে বুচেনওয়াল্ড ক্যাম্পে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল, যেখান থেকে তারা ১১ এপ্রিল, ১৯৪৫-এ মার্কিন সামরিক বাহিনী দ্বারা মুক্ত হয়েছিল।

যুদ্ধের পর যখন বোর্ন ভাইয়েরা ফ্রান্সে ফিরে আসেন, আইজ্যাক ওডেটের সঙ্গে পুনরায় সংযোগ স্থাপন করেন। নাইস শহরে তিনি দেখা করেছিলেন। এদিকে জোসেফ উত্তর নর্মান্ডি অঞ্চলের ক্যালভাডোসে পুনরুদ্ধার করেন। যেখানে তিনি একজন ফার্মাসিস্ট মার্গুরাইট লেসেনের সঙ্গে দেখা করেন। তিনি খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করেন এবং তাকে বিয়ে করেন। এলিজাবেথসহ এই দম্পতির দুটি কন্যা ছিল।

কিন্তু জোসেফ তার যুদ্ধকালীন অভিজ্ঞতার দ্বারা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন। আইজ্যাকের মতে, তার ছোট ভাই সেই বছরের কথা বলতে সহ্য করতে পারেনি। ১৯৭২ সালে মাত্র ৪৭ বছর বয়সে, জোসেফ একটি জানালা থেকে লাফ দিয়ে আত্মহত্যা করেছিলেন। আত্মহত্যার কারণ জানা না গেলেও, আইজ্যাক বিশ্বাস করেছিলেন যে, ক্যাম্পে বাবা এবং তার দুই ভাইকে হারিয়ে জোসেফ এক ধরণের অপরাধবোধে ভুগছিলেন। “কিসের জন্য দোষী? আমরা সবসময় জানি না। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি যে, প্রত্যেক ব্যক্তি, প্রিয়জনকে হারানোর জন্য সর্বদা তাকে বলে-বা নিজেকে …’

আরো পড়ুন:

৯০ বছর ধরে খুঁজে চলেছেন শেকড়ের স্বীকৃতি

বোর্নের বাবা মারা যাওয়ার পর, তাকে ‘জাতির ছাত্র’ উপাধিতে ফ্রান্সে একটি মর্যাদা দেওয়া হয়েছিলো। যুদ্ধ, সন্ত্রাসী হামলার শিকার বা যারা দেশের সেবা করার সময় মারা গেছে তাদের শিশুদের জন্য। এর মানে হলো তিনি তার শিক্ষার জন্য একটি সম্পূর্ণ বৃত্তি পেয়েছিলেন, যা তিনি সম্মানের সঙ্গে গ্রহণ করেছিলেন।

ফরাসি দৈনিক ‘লিবারেশন’ এর সঙ্গে ২০১৫ সালের একটি সাক্ষাৎকারে বোর্ন স্বীকার করেছিলেন যে, তিনি যখন একজন সরকারী কর্মচারী হিসাবে, তিনি নতুন ফরাসিদের যখন নাগরিক সনদ প্রদান করেছিলেন, তখন তিনি তার বাবার কথা ভেবেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘আমি একজন রাষ্ট্রহীন শরণার্থীর মেয়ে। যে কিনা শুধুমাত্র ১৯৫০ সালে ফরাসি হয়েছিলো।

সূত্র: ফ্রান্স২৪

Get in Touch

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Related Articles

অভিবাসীর সঙ্গে থাকুন

10,504FansLike
2FollowersFollow
96SubscribersSubscribe

সাম্প্রতিক ঘটনা