শুক্রবার, 4 এপ্রিল, 2025

নাৎসি বাহিনী ইউরোপজুড়ে যেভাবে গণহত্যা চালিয়েছে

প্রথমে পুরুষদের নিয়ে যাওয়া হয়। তারপর তরুণীদের। আরেকজন গর্ভবতী নারী মোটেও হাঁটতে পারতেন না। একজন তাকে প্রচণ্ড মারধর করে। পরবর্তীতে তার গর্ভের শিশুটিকে তার পেটে গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয়।

“প্রিয় বানেতলা, আমাকে অবশ্যই বলতে হবে যে, আমার ছোট দুটি সন্তান মারা গেছে।” ১৯৪৩ সালে এই কথাটি মার্গারেট ব্যামবার্গার বার্লিনে থাকা তার বোনকে একটি চিঠিতে লিখেছিলেন। চিঠিটি গোপনে “জিপসি ক্যাম্প” থেকে পাচার করতে সক্ষম হয়েছিলেন তিনি। মার্গারেট তার স্বামী উইলি এবং তাদের সন্তানদের সবাইকে ডেথ ক্যাম্পে আটক করা হয়েছিল। হত্যার হাত থেকে মার্গারেট এবং উইলি বেঁচে গেলেও দুভার্গ্যজনকভাবে তাদের সন্তানরা আর পারেনি।

বন্দিরত ব্যামবার্গার তার আত্মীয়-স্বজনদের কাছে একটি চিঠি পাঠাতে সক্ষম হয়েছিলেন। তিনি চিঠিতে কড লিভার অয়েল, কাশির সিরাপ, ভিটামিন সি, ওয়াশিং পাউডার এবং খোঁসপাচড়া থেকে বাঁচার কিছু ঔষুধ পাঠানোর অনুরোধ করেছিলেন। ক্যাম্পের ভয়াবহ পরিস্থিতির উল্লেখ করে লুকানো বার্তা পাঠাতে রোমান ভাষা ব্যবহার করেছিলেন।

এই চিঠির অবশিষ্টাংশ, সেইঙ্গে ৬০টি অন্যান্য সাক্ষ্য, রোমআর্কাইভের ভয়েস অব দ্য ভিক্টিমস পোর্টালে জার্মান, ইংরেজি এবং রোমানিতে মূল সংস্করণে অধ্যয়ন করা যেতে পারে। বিশেষজ্ঞরা ইউরোপ জুড়ে ২০টি দেশের নির্যাতিত সংখ্যালঘুদের চিঠি এবং বিবৃতি সংগ্রহ করেছেন, যা সমন্বয় করেছেন ইতিহাসবিদ করোলা ফিংস। দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে বেলারুশ, বেলজিয়াম, বসনিয়া-হার্জেগোভিনা, জার্মানি, এস্তোনিয়া, ফ্রান্স, ইতালি, ক্রোয়েশিয়া, লাটভিয়া, নেদারল্যান্ডস, অস্ট্রিয়া, পোল্যান্ড, রোমানিয়া, রাশিয়া, সুইজারল্যান্ড, সার্বিয়া, স্লোভাকিয়া, চেক প্রজাতন্ত্র, ইউক্রেন এবং হাঙ্গেরি।

হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যান্টিজিগানিজমের রিসার্চ সেন্টারের ফিংস ডয়েচেভেলেকে বলেছেন যে, সংগৃহীত এসব উপাত্তের বিশেষত্ব হলো, এতে অপরাধীদের দিকে মনোযোগ দেওয়া হয়নি। তা স্বত্বেও সিন্টি এবং রোমাদের কণ্ঠস্বর শোনা গেছে। এসব বয়ান নিপীড়নের সময় থেকে বা তার অল্প সময়ের পরের। পরবর্তীতে ভুক্তভোগীরা তাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের সাক্ষ্য দিতে শুরু করেছিল। এর মধ্য দিয়ে তখন অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনার প্রাথমিক প্রচেষ্টা শুরু হয়েছিল।

রাজনীতি

মার্গারেট ব্যামবার্গারের সন্তানদের মতো, উশউইটজ-বিরকেনাউ ডেথ ক্যাম্পে নিহত বন্দীদের অধিকাংশই ক্ষুধা, রোগ বা লাগামহীন সহিংসতায় মারা গিয়েছিল। ফিংস বলেন, ২রা অগাস্ট, ১৯৪৪-এর রাতটি ছিল সিন্টি এবং রোমাদের জাতিগতভাবে অনুপ্রাণিত নিপীড়নের ‘ভয়াবহতম’ পর্যায়। রোমানি হলোকাস্টে এটি সত্যিই একটি ভয়াবহ দিন ছিল, যেটা পোরাজমোস নামেও পরিচিত। ২০১৫ সালে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট ২ অগাস্টকে সিন্টি এবং রোমাদের জন্য রোমা হোলোকাস্ট মেমোরিয়াল ডে হিসাবে ঘোষণা করে।

আরো পড়ুন:

কলাম্বিয়ায় যুদ্ধ আর লোভের বলি আদিবাসীরা

যাহোক, করোনার কারণে গত বছর বছর দিনটি মূলত ডিজিটাল অনুষ্ঠানের মাধ্যমে স্মরণ করা হয়েছে। ১৯৪৪ সালের সেই ভয়ানক রাতে গ্যাসের আঘাতে নিহতদের মধ্যে ছিলেন জিলি শ্মিটের মেয়ে; ৪ বছর বয়সী গ্রেটেল তার দাদা-দাদি, তার খালা এবং তার ছয়জন চাচাত ভাই। কাজ করার জন্য উপযুক্ত বলে মনে করা অন্যান্য বন্দীদের মতো গ্রেটেলের মাকে অন্যত্র নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তিনি ট্রেন থেকে পালানোর চেষ্টা করেছিলেন পরিবারের কাছে ছুটে যাওয়ার জন্য। কিন্তু কুখ্যাত এসএস ডাক্তার জোসেফ মেঙ্গেল তার মাথায় চড় মেরে তাকে আবার ওয়াগনের মধ্যে নিয়ে নিয়ে যান। শ্মিট বলেন, ‘তিনি আমার জীবন বাঁচিয়েছিলেন, কিন্তু তিনি আমাকে কোনো সেবা দেননি।’

মিউনিখের ১০বছর বয়সী মানো হোলেনরেইনার তাদের মধ্যে ছিলেন, যাদেরকে তার বাবা-মায়ের সঙ্গে রাভেনসব্রুক কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি উশউইটজে অনেক আত্মীয়কে হারিয়েছেন; চাচাতো ভাইসহ তাদের সন্তান, খালা এবং তার দাদী- যাকে তিনি খুব ভালোবাসতেন।

ক্যাথলিক শিশুদের বাড়ি থেকে হত্যা

ফ্রাঞ্জিস্কা কুর্জ তার চার সন্তানকে হারিয়েছিলেন। অটো, সোনজা, আলবার্ট ও থমাসকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল এবং পরে তাদের নির্বাসিত করার আগে একটি শিশুকে বাড়িতে রাখা হয়েছিলো। ১৯৪৬ সালে কুর্জ দক্ষিণ জার্মানির সেন্ট জোসেফস্ফলেজ ক্যাথলিক শিশুদের বাড়ির তত্ত¡াবধায়নকারী মাকে চিঠি লিখেছিলেন। পুলিশ তাকে বলেছিল যে, ‘আমার চার সন্তান উশউইটজে ছিল।” তাদের জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল; ‘পৃথিবীতে আপনি এখনও এই দরিদ্র সন্তানদের কাছ থেকে কী চান? তাদের উত্তর সহজ এবং সংক্ষিপ্ত ছিল ‘নির্মূল’। তাকে ‘চুপ করে থাকতে’ সতর্ক করা হয়েছিল। অন্যথায় কুর্জকে বলা হয়েছিল, তাকে এবং তার কনিষ্ঠ সন্তান মারিয়া উভয়কেই একটি বন্দী শিবিরে পাঠানো হবে। অটো, সোনজা, থমাস এবং আলবার্ট সকলেই উশউইটজে খুন হয়েছিল; ক্যাথলিক চার্চ তাদের রক্ষা করেনি। ২৯ সিন্টি শিশু সেন্ট জোসেফসেফ্লজ চিলড্রেন হোমের মধ্যে মারা যায় এবং মাত্র চারজন বেঁচে যায়।

আরো পড়ুন:

পুলিশ হেফাজতে এখনো কেনো আদিবাসীরা মারা যাচ্ছে?

এটাই একমাত্র ঘটনা ছিল না। ১৯৪৩ সালের মে মাসে, উশউইটজে নির্বাসন এবং বাধ্যতামূলক বন্ধ্যাত্বকরণের হুমকি প্রসঙ্গে; অস্কার রোজ ব্রেসলাউয়ের আর্চবিশপের কাছে লিখেছিলেন: ‘আমাদের ক্যাথলিক চার্চ যদি আমাদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে আমরা এমন ব্যবস্থার সম্মুখীন হব, যা নৈতিক এবং আইনগতভাবে, সব ধরনের মানবতার উপহাস। তিনি বেদনাবোধ নিয়ে উল্লেখ করেছিলেন যে, এটি শুধুমাত্র কয়েকটি বিচ্ছিন্ন পরিবারের মঙ্গলের জন্য হুমকি নয় বরং রোমান ক্যাথলিক চার্চের ১৪ হাজার সদস্যের জন্যই হুমকি।’

ফ্রাঞ্জিস্কা কুর্জ তার চার সন্তানের ভাগ্য সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে একটি চিঠি লিখেছিলেন, যাদেরকে উশউইটজে নির্বাসিত করা হয়েছিল। করোলা ফিংস বলেন, যুগোস্লাভিয়া এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের দখলকৃত অঞ্চলে উদাহরণ রয়েছে, ‘যেখানে মুসলিম সম্প্রদায় রোমা প্রতিবেশীদের রক্ষা করেছিল। তাদের নির্বাসন এড়াতে সাহায্য করেছিল।’

ইউরোপে গণহত্যা: নিষ্ঠুরভাবে পদ্ধতিগত ও ভয়ঙ্করভাবে স্বতঃস্ফূর্ত

ইউরোপে যেখানেই নাৎসিরা পা রেখেছে, সেখানেই সিন্টি এবং রোমাদের নির্যাতিত করেছে। ফলে বাধ্য হয়ে তারা ক্রমাগত জীবনের জন্য লড়াই করে গেছে। অনেককে হত্যা করা হয়েছিল; ক্যাম্পে বা গণ-গুলিবর্ষণে।

জার্মান-অধিকৃত পোল্যান্ডে মৃত্যু শিবির ছিল। আনুমানিক ১৮০টি অন্যান্য স্থানও ছিল, যেখানে গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে বলে জানা যায়। এবং যখন সোভিয়েত ইউনিয়ন বা যুগোস্লাভিয়ার কথা আসে তখন জানা যায়, ‘অধিকাংশ শিকারকে শিবিরে হত্যা করা হয়নি। তবে সেখানেই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছিল।’

অধিকৃত বোহেমিয়া এবং মোরাভিয়ায় আজকের চেক প্রজাতন্ত্র, সিন্টি এবং রোমাকে উশউইটজে নির্বাসিত করার আগে লেটি এবং হোডোনিন ক্যাম্পে আটক করা হয়েছিল। ‘ক্রোয়েশিয়ার জেসেনোভাক একটি বিশেষ ভয়ঙ্কর শিবির ছিল। যেখানে অনেককে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছিল।’

ক্রোয়েশিয়া: ‘আমাদের এখানে মারার জন্য পাঠানো হয়েছিল’

জোসিপ জোকা নিকোলিক ছিলেন একজন সঙ্গীতজ্ঞ। যিনি প্রিদাভাকের ছোট বসতিতে ১৯৪২ সাল পর্যন্ত তার প্রথম বছরগুলি কাটিয়েছিলেন। তারপরে পুলিশ এবং ফ্যাসিবাদী ক্রোয়েশিয়ান উস্তাসা আন্দোলনের অন্যান্য ব্যক্তিরা যারা ইন্ডিপেন্ডেন্ট স্টেট অব ক্রোয়েশিয়ার (এনডিএইচ) প্রতি অনুগত ছিল তারা ঘরে ঢুকে তার এবং অন্যান্য রোমা পরিবারকে নিয়ে যায়। তাদের বলা হয়েছিল যে, তাদের পুনর্বাসন করা হচ্ছে। ‘সবচেয়ে বয়স্ক মানুষ থেকে কনিষ্ঠ সন্তান পর্যন্ত।’ তার স্ত্রী তাদের ৮ মাস বয়সী মেয়ে, বাবা-মা, ভাই এবং তাদের পরিবার সবাইকে গরুর ট্রাকে করে জেসেনোভাক কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।

নিকোলিক বুঝতে পেরেছিলেন যে, ‘তাদের হত্যার জন্য সেখানে আনা হয়েছে।’ তাকে নির্মমভাবে তার স্ত্রী এবং সন্তানের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার জন্য অন্য পুরুষদের সঙ্গে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। কোনো প্রকারে তিনি পালাতে সক্ষম হন এবং প্রতিরোধ যোদ্ধাদের সঙ্গে যোগ দেন। কিন্তু জেসেনোভাকে তার পুরো পরিবারসহ হত্যা করা হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বিরুদ্ধে ১৯৫২ সালের বিচারে নিকোলিক একজন সাক্ষী ছিলেন। যিনি অবশ্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পালিয়ে গিয়েছিলেন।

উশউইটজ-বিরকেনাউ ডেথ ক্যাম্পের একটি স্মারক পাথর যা তৎকালীন গণহত্যাকে স্মরণ করিয়ে দেয়। ছবি: সংগৃহীত

সার্বিয়া: ‘ইহুদি এবং জিপসি উভয় প্রশ্ন’ সমাধান করছে

১৯৪১ সালে অক্টোবরের শেষের দিকে মিলেনা স্ট্যানকোভিচ প্রতিবেদনে জানান, জার্মানরা তার বেলগ্রেড জেলাকে ঘিরে ফেলে। ‘সার্বিয়ার রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর দু’জন এজেন্ট এবং দুজন জেন্ডারমেস আমাদের অ্যাপার্টমেন্টে ঢুকে পড়ে।’ তার মনে পড়ে তার স্বামী এবং এক ভাই নগরের কতৃপক্ষের দ্বারা নিযুক্ত ছিলেন। তাদের সৎপুত্র ছিলেন একজন সঙ্গীতজ্ঞ। আর আরেক ভাই ছিলেন একজন শ্রমিক। তাদের সকলেরই সন্তান ছিল এবং সকলের সার্ব নাগরিকত্ব ছিল।

পুরুষদের একটি শিবিরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল- যেখানে ১,৫০০ জন রোমাকে আটক করা হয়েছিল। কয়েকদিন পর শহরের বাইরে তাদের গুলি করে হত্যা করা হয়।
পুরুষদের হত্যার মাত্র এক মাসেরও বেশি সময় পরে রোমঞ্জা-রোমানি মহিলাদের তাদের বাচ্চাদেরসহ জোরপূর্বক ট্রাকে করে একটি বন্দী শিবিরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেখানে যেমন ঠাণ্ডা ছিল, তেমনি ক্ষুধাও ছিল। নাটালিজা মিরকোভিচ জানান ‘আমার সবচেয়ে ছোট বাচ্চা মারা গেছে কারণ আমি তাকে আর বুকের দুধ খাওয়াতে পারিনি।’

কেউ প্রমাণ করতে পেরেছিল যে, তাদের স্থায়ী বসবাসের জায়গা রয়েছে। ফলে তাকে পরে বিনামূল্যে যেতে দেওয়া হয়েছিল। কেউ কেউ তাদের প্রতিবেশীদের পক্ষে কথা বলেছিল। কিছু সম্ভবত ইহুদি বন্দীদের সঙ্গেই নিহত হয়েছিল। সার্বিয়ার জার্মান সামরিক প্রশাসনের প্রধান ১৯৪২ সালের অগাস্টে গর্ব করেছিলেন যে, সার্বিয়াই একমাত্র দেশ যেখানে ‘ইহুদি এবং জিপসি উভয় প্রশ্ন’ এর ‘সমাধান’ করা হয়েছে।

হাঙ্গেরি: গর্ভবতী নারীকে মেশিনগান দিয়ে গুলি করা হয়েছে

১৯৪৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে অ্যাঞ্জেলা লাকাতোস গর্ভাবস্থার শেষ পর্যায়ে ছিলেন। তার সংকোচন বেদনাদায়ক ছিল। হঠাৎ ৩০-৪০ জন জেন্ডারমেস পশ্চিম হাঙ্গেরির তার রোমা বসতিতে এসে পৌঁছায়। রোমাদের তাড়িয়ে দেওয়ার জন্য তারা দৃঢপ্রতিজ্ঞ। যখন লাকাটোস সাহায্যের কথা বলেন, তখন একজন জেন্ডারমেস উত্তর দেন ‘জাহান্নামে যাও!’ ১২০ রোমাকে একটি শস্যাগারের ভিতরে জোরপূর্বক নির্যাতন করা হয়েছিল।

প্রথমে পুরুষদের নিয়ে যাওয়া হয়। তারপর তরুণীদের। আরেকজন গর্ভবতী নারী মোটেও হাঁটতে পারতেন না। একজন তাকে প্রচণ্ড মারধর করে। পরবর্তীতে তার গর্ভের শিশুটিকে তার পেটে গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয়। লাকাতোস এবং অন্যদের একটি গর্তে নিক্ষেপ করা হয়েছিল। ‘আমি সেখানে আমার দুই ভাইসহ বাবাকে মৃত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেছি। আমি নিজে অর্ধেক গর্তে ঝাঁপ দিয়েছিলাম, অর্ধেক পড়ে গিয়েছিলাম।’

আরো পড়ুন:

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকরা যেভাবে বাংলায় দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করেছিল

তিনি তার মাথার উপর তার স্কার্ফ টেনে নিলেন ‘কি ঘটতে চলেছে তা এড়াতে। কিন্তু তারপরেই গুলির বৃষ্টি শুরু হয়।’ তাকে আটবার আঘাত করা হয়েছিল; তার বাহুতে, পায়ে এবং পেটে। অন্যরা তার উপরে পড়েছিল। তাদের শরীরে গুলি পাওয়া গিয়েছিলো। গর্ত থেকে আরোহণ করতে তার কয়েক ঘন্টা সময় লেগেছিলো।

লাকাতোস বেঁচে গিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি গুরুতর আহত হন। তিনি তার পুরো পরিবার এবং তার অনাগত সন্তানকে হারিয়েছেন। যুদ্ধের পরে তিনি অপারেশন কমান্ডার জোসেফ পিন্টারের বিরুদ্ধে সাক্ষী দিয়েছিলেন। তিনি জোর দিয়ে বলেছিলেন যে, অপারেশনটি কতটা পুঙ্খানুপুঙ্খ এবং পদ্ধতিগত ছিল। পিন্টারকে যুদ্ধাপরাধের জন্য দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল। এবং ১৯৪৮ সালের সেপ্টেম্বরে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিল। রোমা জনগণের হত্যায় জড়িত থাকার জন্য খুব কম অপরাধীদের মধ্যে একজনকে বিচারের মুখোমুখি করা হয়েছিল।

রাশিয়া: উলঙ্গ করে জীবন্ত গর্তে ফেলে দেওয়া হয়েছে

লিদিজা নিকিতিকনা ক্রিলোভা একটি ‘দুঃস্বপ্নের অপরাধ’ সম্বন্ধে বলেছেন ‘জার্মান আক্রমণকারীরা আলেকসান্দ্রোভকা গ্রামে শান্তিপ্রিয় সোভিয়েত নাগরিকদের উপর আক্রমণ করে। তারা রোমাদের যৌথ খামারের সদস্যও।’ ১৯৪২ সালের এপ্রিলে একজন জার্মান অফিসারের একটি তালিকা ছিল, যেটা দেখে তিনি এক এক করে গ্রামবাসীদের নাম বলতেন। অ-রোমাদের বাড়িতে পাঠানো হয়েছিল।

রোমা পরিবারগুলিকে তখন খাদের কিনারায়, ‘গবাদি পশুর মতো’ চাবুক দিয়ে তাড়ানোর আগে পোশাক খুলতে বাধ্য করা হয়েছিল তাদের। মায়ের চোখের সামনেই গুলিবিদ্ধ হয় বড় শিশুরা। তারপর বাচ্চাদের হাত ছিঁড়ে গর্তে ফেলে দেওয়া হয়।

নিকিতিনা ক্রিলোভা বলছেন, ‘শুধু শিশুদেরই গর্তে জীবন্ত নিক্ষেপ করা হয়নি।’ ‘জার্মানরা একজন অসুস্থ বৃদ্ধা মহিলাকে তার কন্যাদের দিয়েই গর্তে ঠেলে দিতে বাধ্য করেছিলো। ক্রিলোভা এবং অন্যরা শুধুমাত্র শেষ মুহূর্তে মৃত্যু থেকে রক্ষা পেয়েছিল। তারা পরে নাৎসি যুদ্ধাপরাধের বিষয়ে সোভিয়েত তদন্তে তাদের সাক্ষ্য দেয়।

আরো পড়ুন:

কেন বাস্তুচ্যুতির ঝুঁকিতে রয়েছেন আদিবাসীরা

পূর্ব ইউরোপের রোমারা ক্ষতিপূরণ প্রত্যাখ্যান করেছে

করোলা ফিংস বলেছেন, অনেক দেশে আজও খুব কম সচেতনতা রয়েছে যে, সিন্টি এবং রোমা সম্প্রদায় পদ্ধতিগত গণহত্যার শিকার হয়েছিল। তিনি বিশ্বাস করেন যে, বৃহত্তর ইউরোপীয় দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের সহিংসতার সম্পূর্ণ মাত্রা স্পষ্ট হবে।

প্রতিক্রিয়া হিসাবে গবেষকরা নাৎসি গণহত্যার একটি বিশ্বকোষ নিয়ে কাজ করছেন; একটি প্রকল্প যা জার্মান পররাষ্ট্র দপ্তর ১.৪ মিলিয়ন ডলার অর্থ দিয়ে সমর্থন করেছে। ২ আগস্ট ১৯৪৪-এ উশউইটজ-বিরকেনাউ ডেথ ক্যাম্পের গ্যাস চেম্বারে ৪ হাজার ৩০০ জন সিন্টি এবং রোমা নিহত হয়। গণহত্যা থেকে বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিরা ভয়াবহতার বর্ণনা দিয়েছেন। আজ অবধি তাদের অনেক বংশধর ক্ষতিপূরণ প্রত্যাখ্যান করেছে।

সূত্র: ডয়েচেভেলে। ভাষান্তর করেছেন রীতা জান্নাত।

Get in Touch

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Related Articles

অভিবাসীর সঙ্গে থাকুন

10,504FansLike
2FollowersFollow
96SubscribersSubscribe

সাম্প্রতিক ঘটনা