সারা বছর ধরে ওঠানামা করতে থাকা তাপমাত্রা পাখির স্থানান্তর ও প্রজননের ওপর নেতিবাচক প্রভাবিত রাখছে
শুধু বেঁচে থাকার তাগিদে হাজার হাজার মাইল পথ পাড়ি দিয়ে এক মহাদেশ থেকে আরেক মহাদেশে ছুটে আসে অভিবাসী পাখির দল। ঋতু বদলের সঙ্গে সঙ্গে খাদ্য ও বসবাসের জায়গা সংস্থানের উদ্দেশ্যে শত শত প্রজাতির পাখির স্থানান্তরিত হওয়ার এ লড়াই ক্রমশ কঠিন ও চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠছে এখন।
দুঃখজনক হলেও সত্য, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বৈশ্বিক উষ্ণতা বেড়ে যাওয়ার কারণে পাখিদের স্বাভাবিক অভিবাসন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং একারণে তারা তাদের নিয়মিত অভিবাসন রুট ও সময় বদলে ফেলতে বাধ্য হচ্ছে। পরিবেশ ও জলবায়ু বিষয়ক গবেষক নিকোলাস জোনজেনের নেতৃত্বে পাখির স্থানান্তর সম্পর্কিত একটি জরিপে এমন চিত্রই ফুঁটে উঠেছে।
জরিপটিতে পরামর্শ দেয়া হয়েছে পাখিদের বর্তমান আবাস ও স্থানান্তরিত হওয়ার এলাকাগুলোকে চিহ্নিত করে আরো মৌলিকভাবে গবেষণা করে উদঘাটন করা প্রয়োজন যে, কীভাবে জলবায়ু এই প্রাকৃতিক ঘটনাকে প্রভাবিত করছে।
এ জরিপে দেখা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তন শুধু যে পাখির আবাসস্থলকেই প্রভাবিত করছে তা নয় বরং একইসঙ্গে পাখির আচরণের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
এর আগের গবেষণাগুলোয় ইঙ্গিত দেয়া হয়েছিল, শান্তিপূর্ণভাবে সহাবস্থানকারী পাখিরা এখন বাসস্থানের অভাবের কারণে একে অপরকে আক্রমণ পর্যন্ত করতে শুরু করেছে। শীতকাল ক্রমশ উষ্ণতার দখলে চলে যাচ্ছে, ডিম ফুঁটে বাচ্চা তৈরী হতেও বিলম্ব হচ্ছে। এমনকি উড়ন্ত পোঁকামাকড় ধরে খাওয়ার ব্যাপারেও একে অন্যের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হতে দেখা যাচ্ছে পাখিদের।
গবেষক জোনজেন বলছেন, ‘সামগ্রিকভাবে পাখিদের স্থানান্তরিত হওয়ার সময় দ্রুততরভাবে এগিয়ে এসেছে। বিশেষ করে ইউরোপে শীতকালে কাটানো প্রজাতির পাখিদের প্রথম আগমনের সময়ের ক্ষেত্রে।’ তদুপরি, এই অনুসন্ধানে একই প্রজাতির অন্যান্য শ্রেণীর পাখিদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের ফলাফল পাওয়া গেছে।
সবমিলিয়ে সহজভাবে জরিপটিতে উঠে এসেছে, পাখিরা যেখান থেকেই রওয়ানা হোক না কেনো তা গড় হিসেবে তুলনামূলক আগে থেকেই হচ্ছে এবং অভিবাসিত এলাকায় তারা আগেভাগেই পৌঁছে যাচ্ছে।

জরিপে অবশ্য এ চিত্রও দেখা গেছে যে, বিরল ক্ষেত্রে উষ্ণ তাপমাত্রা নেতিবাচক প্রভাব নাও রাখতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে উষ্ণ তাপমাত্রা সদ্য বাড়তে থাকা পাখিদের বেঁচে থাকার লড়াইয়ে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।
পাখিদের অভিবাসন প্রক্রিয়া নিয়ে সাম্প্রতিক গবেষণাগুলিতে উঠে এসেছে, মিলনের জন্য উপযুক্ত এলাকায় আগমণের সময় স্ত্রী ও পুরুষ পাখি আলাদা হতে পারে। এটি হওয়া স্বাভাবিক নয়। তবে বসন্তের তাপমাত্রা উষ্ণ হওয়ার কারণে পুরুষ পাখিরা স্বাভাবিকের চেয়ে আরো আগে আসতে পারে। এর ফলে স্ত্রী পাখিরা তাদের সঙ্গে যোগদান করতে দীর্ঘ সময় পিছিয়ে যায়।
জরিপটির মাধ্যমে দেখা গেছে, বিষয়টি কেবল বসন্তের তাপমাত্রাই নয়, যা অভিবাসন প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে। কিছু পাখি শরৎকালে অভিবাসিত হয়, কিছু পাখি আবার বসন্ত কিংবা শরৎ-উভয় ঋতুতেই অভিবাসিত হয়। আর এসব কিছুই নিয়ন্ত্রিত হয় মূলত তাপমাত্রা দ্বারা। তাপমাত্রার ওপরই নির্ভর করে পাখিদের অভিবাসনের এই সময়সীমা। এর মানে দাঁড়ায়, সারা বছর ধরে প্রকৃতিতে বয়ে চলা উষ্ণতা ও শীত প্রজাতিভেদে পাখির স্বাস্থ্য ও অভিবাসনের ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলছে।
সূত্র: ন্যাশনাল জিওগ্রাফি