বৃহস্পতিবার, 22 ফেব্রুয়ারি, 2024

জলবায়ু পরিবর্তন নারীদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে

দুর্যোগ সম্পর্কিত মৃত্যুর হার পুরুষদের তুলনায় নারীদের অনেক বেশি। অথচ ২০০৪ সালে ভারত মহাসাগরে সুনামির কারণে প্রায় ৭০-৮০ শতাংশ মৃত্যুর জন্য শুধু নারীদের দায়ী করা হয়েছিলো

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রায় ৪০ শতাংশ নারী ও মেয়ে তাদের ঘরবাড়ি থেকে বিতাড়িত হয়, যেটা তাদের মানবসৃষ্ট বিপর্যয়ের দিকে ধাবিত করে-জাতিসংঘের একটি সমীক্ষায় এমনটা উল্লেখ করা হয়েছে।

বন্যা, সুনামি, ভূমিকম্প ও মহামারির মতো মানবসৃষ্ট বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় নারী ও মেয়েরা নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য সেবা ও শিক্ষার সুবিধা এমনকি থাকার জন্য নিরাপদ জায়গার ব্যবস্থা করতে অনেক ভয়াবহ অবস্থার মুখোমুখি হয়। বলা বাহুল্য, শোষণ, রুগ্ন স্বাস্থ্য, সামাজিক কুসংস্কার এবং অনাকাঙিক্ষত গর্ভধারণের জন্যও তাদের পরিস্থিতি আরো বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।

জলবায়ুর পরিবর্তনের উপাদানগুলি নারী এবং মেয়েদের স্বাস্থ্য এবং সুস্থতার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। এটা যদিও আশ্চর্যজনক কিংবা নতুন কোনো ঘটনা নয়। কারণ যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য, অধিকার (এসআরএইচআর) এবং জলবায়ু সম্পর্কিত কাজের মধ্যে যে সংযোগগুলি আছে, সেসব বিষয়ে যথেষ্ট জানাশোনা কিংবা সচেতনতা কারো নেই।

জলবায়ু পরিবর্তন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের নিষ্ক্রিয়তা, নারী ও মেয়েদের উপর সরাসরি কীভাবে প্রভাব ফেলে-সেটা নিয়ে গবেষণা করার এখনই উপযুক্ত সময়। ভারতে নারীদের নায্য অধিকার পাওয়ার জন্য বিকল্প কোনো পথ তৈরি করতে হলে, নারী ও মেয়েদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়া, অসাম্প্রদায়িক পর্যায়ের কর্মকাণ্ডে জড়িত হওয়া এবং নায্য পরিবর্তনের পতাকাবাহী হওয়ার জন্য ক্ষমতাপ্রাপ্ত হওয়া অপরিহার্য।

জলবায়ু ন্যায়বিচার থেকে আমরা কতদূর? জলবায়ু ন্যায়বিচার হলো এমন একটি ধারণা, যা জলবায়ু পরিবর্তনের লাভ ও বোঝার ক্ষেত্রে নায্য বিভাজন। এই পরিবর্তনগুলি মোকাবেলা করার সঙ্গে যে দায়িত্বগুলো আসে সেগুলিকেও মেনে নেওয়া। যেটি জাতিসংঘের এজেন্ডা ২০৩০ এর অধীনে এসডিজি-১৩ এর একটি মৌলিক দিক।

জলবায়ু ন্যায়বিচার প্রসঙ্গটি আমাদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক এবং লিঙ্গ বৈষম্য বিষয়ক প্রেক্ষাপটে ঐতিহাসিকভাবে অবান্তরমূলক একটি ইউটোপিয়ান ধারণা। দারিদ্র, নিরক্ষরতা, সামাজিক অনাগ্রসরতা এবং লিঙ্গ বৈষম্য আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে নারীদের একটা বড় অংশকে একটি মোড়কে ফেলে দেয়। যেখানে তারা বেঁচে থাকার মৌলিক সমস্যাগুলোর সঙ্গে ক্রমাগত লড়াই করছে। যেমন পানির ঘাটতি, খাদ্য নিরাপত্তা, পুষ্টিহীনতা, কর্মসংস্থানের অভাব, শিক্ষার সুবিধা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং মৌলিক স্বাস্থ্যসেবার সুবিধা বৃদ্ধিতে ক্রমাগত লড়াই করতে হচ্ছে।

জলবায়ু পরিবর্তন প্রায়ই এই সমস্যাগুলিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। বিশেষ করে নারী ও মেয়েদের সমস্যাগুলিকে আরো গভীর করে। বেশিরভাগ ভারতীয় নারী, যারা এই পরিবেশের অন্তর্গত তাদের যৌন প্রজনন স্বাস্থ্যের মৌলিক অধিকারের অভাব রয়েছে। তাদের স্বাস্থ্যের চাবিকাঠি যেটা অনাকাক্সিক্ষত গর্ভধারণ ও বৃহত্তর পরিবারের দিকে ধাবিত করে। এর ফলে তাদের আর্থ-সামাজিক অবস্থা আরো ঝুঁকিপূর্ণ হয়।

জলবায়ু পরিবর্তন- বিদ্যমান চরম দুর্বিষহ আবহাওয়ার কারণে কীভাবে নারী ও শিশুরা সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হয়-তা দেখানোর জন্য বিশ্বব্যাপী ভুরিভুরি উদাহরণ রয়েছে। দুর্ভাগ্যবশত, ভারতের নীতিগুলো কোনো ধরনের লিঙ্গ সংবেদনশীলতাকে প্রতিফলিত করে না। মূলত এটি হয়ে থাকে প্রাথমিকভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের লৈঙ্গিক এবং সামাজিক দিকগুলির পুরো বিষয়ে অসচেতনতার কারণে। এসব বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করা অতীব জরুরি। কারণ লিঙ্গ জলবায়ু প্ররোচিত আবহাওয়া চরমভাবে পরিবর্তনের জন্য ভিন ভিন্ন লিঙ্গ ভিন্নভাবে প্রতিক্রিয়া জানায়। মূলত বিদ্যমান সামাজিক বৈষম্যের কারণে এটি অতিরঞ্জিত হয়।

কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, দুর্যোগ সম্পর্কিত মৃত্যুর হার পুরুষদের তুলনায় নারীদের অনেক বেশি। ক্ষমতার লিঙ্গগত পার্থক্য এবং উপযুক্ত তথ্যের অভাবের ফলে প্রাথমিকভাবে যেসব প্রতিক্রিয়া থাকে এই ধরনের পরিস্থিতিকে মোকাবিলা করার জন্য, সে বিষয়ে তারা সচেতন নয়। এ প্রসঙ্গে সাম্প্রতিক কিছু উদাহরণ দেয়া যেতে পারে, ২০০৪ সালে ভারত মহাসাগরে সুনামির কারণে প্রায় ৭০-৮০ শতাংশ মৃত্যুর জন্য শুধু নারীদের দায়ী করা হয়েছিলো। ১৯৯১ সালে বাংলাদেশে ঘূর্ণিঝড়ে প্রাণহানির মোট ৯১ শতাংশ ছিল নারী।

আমরা যদি ভারতের ওড়িশ্যার দিকে তাকাই, সেখানে উপকূলবর্তী বেশিরভাগ পরিবারগুলো নারীদের দ্বারা পরিচালিত হয়। কেননা ২০-৪৫ বছর বয়সী পুরুষদের কাজের জন্য কাছাকাছি শহরে বারবার যেতে বাধ্য হয়।

এ প্রসঙ্গে বিহারে বার্ষিক বন্যার সঙ্গে সম্পর্কিত লিঙ্গগত দুর্বলতার উপর ২০২১ সালের একটি সমীক্ষা করা হয়। ক্লাইমেট অ্যাকশন নেটওয়ার্ক সাউথ এশিয়ার সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ভারতে জলবায়ু-পরিবর্তনজনিত বাস্তুচ্যূতি এবং অভিবাসনের কারণে নারীদের কমপক্ষে ১২-১৪ ঘণ্টা অতিরিক্ত কাজ করতে হয়। যার মধ্যে রয়েছে কৃষি ও গৃহস্থালির কাজ। গৃহস্থালির মধ্যে রয়েছে, রান্না করা, পানি সংরক্ষণ করা, সন্তানদের যত্নআত্মি করা। জলবায়ু সংক্রান্ত বিপর্যয়ের কারণে সৃষ্ট এই পরিস্থিতিগুলিও নারী ও মেয়েদের মধ্যে যৌন নির্যাতন, বাল্যবিবাহ ইত্যাদি বাড়িয়ে দিচ্ছে।

সাম্প্রতিক আইপিসিসি রিপোর্ট টেকসই উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণভাবে জলবায়ু ন্যায়বিচার এবং লিঙ্গ ও সামাজিক সমতার জন্য প্রয়োজনীয়তার কথা পুনরাবৃত্তি করেছে। প্রতিবেদনে স্থিতিস্থাপকতা গড়ে তোলা জরুরি এভং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ঝুঁকি ও দুর্বলতা হ্রাসের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। মূল্যায়ণ প্রতিবেদনটিতে লিঙ্গ বৈষম্য, মানসিক স্বাস্থ্য, সম্পত্তি ও জীবনের ক্ষয়ক্ষতি, জলবায়ু সংক্রান্ত ক্ষতির কারণে দরিদ্র ও দুর্বলদের জন্য ক্ষতিপূরণের ধারণা নিয়েও আলোচনা করা হয়।

কীভাবে ভারতে জলবায়ু ন্যায়বিচার অর্জন করা যেতে পারে? ক্রমবর্ধমানভাবে জলবায়ু পরিবর্তন এবং এআরএইচআর এর মধ্যে বিদ্যমান সংযোগগুলি চিহ্নিত করার উপর মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করার মাধ্যমে আরও লিঙ্গ-পরিবর্তনমূলক জলবায়ু বিষয়ক কর্মকাণ্ডকে উৎসাহিত করতে হবে। যেমন জলবায়ু অ্যাকশন প্রক্রিয়ার অধীনে-জেন্ডার প্ল্যান ইউনাইটেড নেশনস ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন ক্লাইমেট চেঞ্জ বা উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার কনস্টিটিউয়েন্সি, ইউএনএফসিসিসির অংশ করে তুলতে হবে।

জলবায়ু ভারসাম্যহীনতার পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য আমাদেরকে আরও লিঙ্গ অন্তভূর্ক্ত, বহু-ক্ষেত্রগত স্টকহোল্ডারদের সম্পৃক্ততার জন্য একটি নীতি নির্ধারণ করা প্রয়োজন। এসব বিষয়ে অধ্যয়ন করার জন্য গবেষণাকে আরো এগিয়ে নিতে হবে। এসআরএইচ এবং জলবায়ু সম্পর্কিত যে তথ্যগুলো রয়েছে, সেগুলাকে একত্রিত করার জন্য বিনিয়োগ বাড়ানো প্রযোজন। যা আমাদের সুন্দর ও সুদূরপ্রসারী সমাধান দেবে। ভৌগলিক অঞ্চলে স্বাস্থ্যক্ষেত্রে সর্বদা বিনিয়োগ করা প্রয়োজন দরিদ্র অঞ্চলগুলিতে এধরনের সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে যে দুর্বলতাগুলো রয়েছে, সেগুলিকে শক্তিশালী করে তুলতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। এজন্য নারীদের বেশি করে শিক্ষার আওতায় আনতে হবে।

নারীদের নিরঙ্কুশ অধিকার এবং তাদের যৌন ও প্রজনন সুস্থতার জন্য স্বাস্থ্যখাতে সহজ প্রবেশাধিকার থাকা অপরিহার্য। ক্ষমতায়নের জন্য তাদের শিক্ষিত হওয়া জরুরী। একইসঙ্গে প্রজনন অধিকারের বিষয়সহ সবক্ষেত্রে তাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করতে হবে।

এসআরএইচ-এর মতে, নারীদের স্বাস্থ্যকে আরো অগ্রাধিকার দেওয়া এবং এটিকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসা প্রয়োজন। তাদের বিশ্বাস, এটা লিঙ্গ সমতা ভিত্তির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে কাজ করবে। ম্যাককিনসে গ্লোবাল ইনন্টিটিউট স্টাডির অনুমান অনুযায়ী, কেবলমাত্র নারীদের সমাধিকার দেওয়ার মাধ্যমে ভারত ২০২৫ সালের মধ্যে তার জিডিপিতে ৭৭০ বিলিয়ন অর্থ যোগ করতে পারবে।

জলবায়ু ন্যায়বিচার, এসআরএইচআর এবং লিঙ্গ সমতার মতো বিষয়টি সুদূরপ্রসারী কোনো ধারণার মতো শোনাচ্ছে। কিন্তু তারপরও ভারতের প্রত্যেকটি জায়গায় নারীদের আরো বেশি অংশগ্রহণ ভারতের টেকসই ও উর্ধ্বমূখী উন্নয়ন বৃদ্ধির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। ভারতীয় সমাজ এবং অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে মহিলাদের অন্তর্ভূক্তিমূলক অংশগ্রহণের জন্য আর কোনো সময় নষ্ট না করে অতি দ্রুত প্রতিকারমূলক পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

লেখক: দেবাঞ্জনা চৌধুরী, লিঙ্গ ও জলবায়ু বিচার বিশেষজ্ঞ। দ্য পাইওনিয়ার-এ প্রকাশিত নিবন্ধটি ভাষান্তর করেছেন রীতা জান্নাত।

Get in Touch

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Related Articles

অভিবাসীর সঙ্গে থাকুন

10,504FansLike
2FollowersFollow
97SubscribersSubscribe

সাম্প্রতিক ঘটনা