শুক্রবার, ২৭ জানুয়ারী, ২০২৩

জলবায়ু বিপর্যয় রোধে ‘গ্রিন ইসলাম’ ধারণা কতোটা কার্যকর?

‘প্রকৃতি এবং পরিবেশের সুরক্ষা ইসলামের অন্যতম আদেশ। তাই পরিষ্কারভাবে শক্তির যথাযথ ব্যবহার মুসলমানদের জন্য নৈতিক ও নৈতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ’

বিশ্বের বৃহত্তম কয়লা এবং পাম তেল রপ্তানিকারক হিসাবে ইন্দোনেশিয়া বৈশ্বিক জলবায়ু সংকটে বড় প্রভাব ফেলেছে। একইসঙ্গে দ্বীপরাষ্ট্রটি নিজেও ক্রমবর্ধমান চরম আবহাওয়া দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে। ২০১৯ সালে সংগঠিত প্রচণ্ড খরা ব্যাপকভাবে বনাঞ্চলের দাবানলকে উস্কে দিয়েছিল। বিপরীতভাবে এর এক বছর পর ২০২০ সালে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাতও হয়েছিল ইন্দোনেশিয়ায়। এর ফলে দেশটি ব্যাপক বন্যার সম্মুখীন হয়েছিল।

২৭০ মিলিয়নেরও বেশি জনসংখ্যার পাশাপাশি ইন্দোনেশিয়া অনেক বেশি সামাজিক এবং পরিবেশগত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। ক্রমবর্ধমান এসব সংকট থেকে পরিত্রানের জন্য কিছুসংখক বিশেষজ্ঞ ধর্মকে আশার রশ্মি হিসাবে মনে করছেন। এ পথ ধরে বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম জনসংখ্যার দেশ হিসেবে ইন্দোনেশিয়ায় পরিবেশ সচেতনতায় ইসলামের আহ্বান বাড়ছে।

জাকার্তার ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর ইসলামিক স্টাডিজের চেয়ারম্যান ফাচরুদ্দিন মাঙ্গুনজায়া ডয়েচেভেলেকে বলেন, ‘এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, পরিবেশ বিষয়ে ইসলামিক দৃষ্টিকোণগত সচেতনতা ইন্দোনেশিয়ার সমস্ত পরিবেশগত আন্দোলনকে শক্তিশালী করছে।’

ইন্দোনেশিয়া তার ১৭ হাজারটিরও বেশি দ্বীপ নিয়ে খুব বিপর্যয়ের মধ্যে রয়েছে। বর্জ্য নিষ্কাশন ছাড়াও দেশের দুটি প্রধান জলবায়ু পাম ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ এবং বন উজাড়-বিষয়ক তথ্য বারবার শিরোনাম হয়ে উঠছে। ইন্দোনেশিয়া শুধু তাপীয় কয়লার জন্য বিশ্বের রপ্তানি চ্যাম্পিয়ন নয় বরং পাম তেলের বৃহত্তম উৎপাদকও বটে। যার ফলে প্রতি বছর বনের বিশাল একটা অঞ্চল উজাড় হয়।

কয়লা এবং পাম তেল ইন্দোনেশিয়ার অর্থনীতির মেরুদণ্ড। যেটা কিনা নির্ভরযোগ্য শক্তি এবং পাম তেল রপ্তানি ছাড়া বাড়বে না। অন্যদিকে এই অর্থনৈতিক মডেলটি সেই সমস্ত লোকদের ক্ষতি করে, যাদের এটি পরিবেশন করার কথা। বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে গ্রীনহাউস গ্যাস নির্গমন এবং বন উজাড় গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য ও জীবিকার উপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ইন্দোনেশিয়ার অনেক প্রত্যন্ত এবং দরিদ্র প্রদেশ নিয়মিত খরার শিকার হয়। যা দেশে দারিদ্র্যতা বাড়িয়ে দিচ্ছে। এক্ষেত্রে ‘গ্রিন ইসলাম’ (গ্রিন ইসলাম বা ‘সবুজ ইসলাম’ বলতে বোঝানো হয়েছে, ‘প্রকৃতি এবং পরিবেশের সুরক্ষায় ইসলামের নিয়মনীতি ও বিধিবিধান) আশা জাগায়। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের দেশ ইন্দোনেশিয়ার জনসংখ্যার প্রায় ৮৭ শতাংশ ‘গ্রিন ইসলাম’কে জলবায়ু বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষার অন্যতম অনুষঙ্গ বলে মনে করে।

আরো পড়ুন:

জলবায়ু পরিবর্তন নারীদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে

ইন্দোনেশিয়ান নৃ-তত্ত্ববিদ ইবনু ফিকরি ডয়েচেভেলেকে বলেন, ‘প্রকৃতি এবং পরিবেশের সুরক্ষা ইসলামের অন্যতম আদেশ। তাই পরিষ্কারভাবে শক্তির যথাযথ ব্যবহার মুসলমানদের জন্য নৈতিক ও নৈতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ।’ আমস্টারডামের ফ্রি ইউনিভার্সিটি থেকে তার সহকর্মী ফ্রিক কলম্বিজনের সঙ্গে একত্রে তিনি ইন্দোনেশিয়ায় গ্রিন ইসলাম বা ‘সবুজ ইসলাম’ বিষয় নিয়ে গবেষণা করছেন। যা ইসলামিক ধারণা এবং শিক্ষা দ্বারা অনুপ্রাণিত এবং মানুষ ও পরিবেশের মধ্যে মিথস্ক্রিয়া তৈরি করে।

রাজনীতির মঞ্চেও গ্রিন ইসলাম ধারণা বেশি নজর কাড়ছে। প্রেসিডেন্ট জোকো উইডোডোর সরকার সম্প্রতি ২০৬০ সালের মধ্যে নেট-জিরো নির্গমন অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণের জন্য ইসলামী নেতা এবং সম্প্রদায়ের সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন। সেই নীতিকে ধরে রেখে গত বছর, পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় পরিবেশ ব্যবস্থাপনা এবং টেকসই বনায়নের উন্নতির জন্য দেশের বৃহত্তম মুসলিম সংগঠন নাহদলাতুল উলামা (ঘট) এর সঙ্গে একটি অংশীদারিত্বমূলক চুক্তি স্বাক্ষর করেছে।

যদিও ফাচরুদ্দিনের মতে, তা যথেষ্ট নয়। জলবায়ু সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির তাগিদ এখনও দেশের অধিকাংশ গ্রামীণ জনগোষ্ঠী এবং ধর্মগুরুদের কাছে পৌঁছায়নি। কাতাডাটা ইনসাইট সেন্টারের ২০২০ সালের একটি সমীক্ষা দেখায় যে, ইন্দোনেশিয়ার নাগরিকরা ধর্মীয় ধর্মগুরুদের তথ্যের উপর সর্বোচ্চ আস্থা রাখে। ফলস্বরূপ, জাকার্তায় ফচরুদ্দিনের ইনস্টিটিউট মুসলিম সমাজের নেতা এবং পরিবেশ বিজ্ঞানীদের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরিতে বিশেষভাবে কাজ করছে।

ফাচরুদ্দিন বলেন, ‘এটি গুরুত্বপূর্ণ যে, ইসলামিক ধর্মগুরুরা কেবল ধর্মীয় শিক্ষাই বোঝেন না। জলবায়ু সুরক্ষার জন্য তাদের তাৎপর্যও বোঝা যায়। যাতে তারা তাদের সচেতনতাকে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপে এগিয়ে নিতে পারে।’ এখন পর্যন্ত তিনি প্রায় এক হাজার ইসলামিক ধর্মগুরুকে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। যারা পরিবেশ সুরক্ষা অনুশীলন করে এবং সারা দেশে বিভিন্ন গ্রামে শিক্ষা প্রদান করে।

আরো পড়ুন:

জলবায়ু পরিবর্তন ও বাস্তুচ্যুতি: দশ বছরের দশটি কৌশল

বোর্ডিং স্কুলগুলিতে সচেতনতা বৃদ্ধি

জলবায়ু সক্রিয়তার নিউক্লিয়াস হিসাবে বোর্ডিং স্কুলগুলির মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে। বিশেষ করে তরুণদের কাছে পৌঁছাতে হবে যে, পরিবেশ সুরক্ষা সম্পর্কে সচেতনতা দরকার।

মাদুরা দ্বীপে একটি ইসলামিক বোর্ডিং স্কুল (পেসান্ট্রেন) পরিচালনাকারী খতিবুল উমাম বলেন, ‘আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আরো ভাবতে হবে। যাতে আমাদের শিক্ষার্থীরা পরিবেশগত সমস্যাগুলিকে চাপ দেওয়ার আগে থেকেই উত্তর খুঁজে পেতে পারে। এবং তাদের নিজস্ব সম্প্রদায়ের সঙ্গে জড়িত হতে পারে।’ ইসলামিক বোর্ডিং স্কুলগুলি ইন্দোনেশিয়ার শিক্ষা ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। শুধু উমামের বোর্ডিং স্কুলে ১১ হাজার শিক্ষার্থী রয়েছে।

পুনঃনবায়ন, টেকসই কৃষি এবং পুনর্ব্যবহারযোগ্য, যার সবকটিরই আঞ্চলিক শিকড় রয়েছে এবং ইসলাম দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছে, এমন বেশ কয়েকটি পরিবেশগত সুরক্ষা প্রকল্পকে সমর্থন করে স্কুলটি ইসলাম এবং পরিবেশ সুরক্ষার সমন্বয়কে তার মূল কাজগুলির মধ্যে একটি করে তুলেছে।

আরে পড়ুন:

গ্লাসগোর সুবাতাস কি আদৌ পৌঁছাবে ‘শ্যামনগরে’?

‘গ্রিন ইসলাম’ এর সীমাবদ্ধতা!

যদিও দিকটি স্পষ্ট। উমাম এটাও জানেন যে, ইন্দোনেশিয়ায় ইসলামি পরিবেশগত সক্রিয়তা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। তিনি বলেন, ‘কেবল আমাদের স্কুলে নয়, সাধারণভাবে সমাজে আমরা যে প্রধান চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছি-তাহলো মানুষকে বোঝানোর চেষ্টা করা যে, কেন এই প্রকল্পগুলি শুধুমাত্র আমাদের জন্য নয়! সমাজের প্রতিটি স্তরের এবং ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।’

বহুত্ববাদ সুযোগ সৃষ্টি

শুধু পরিবেশ রক্ষায় বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠীর দীর্ঘমেয়াদি মিলন প্রয়োজন। অনেক বিশেষজ্ঞ বলেছেন, গোটা সমাজের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট পদ্ধতির প্রয়োজন। ফাচরুদ্দিন ইন্দোনেশিয়ার বহুত্ববাদকে একটি বড় সুযোগ হিসেবে দেখছেন। ‘ইসলামের আগে থেকে আমরা ঐতিহ্য থেকে অনেক কিছু শিখেছি। ইন্দোনেশিয়ায় আমাদের গণতান্ত্রিক পরিস্থিতির কারণে, আমরা শুধু প্রকৃতি ও পরিবেশকে নয় বরং সমস্ত মানুষ ও তাদের ধারণাকে সম্মান করি।’

আরো পড়ুন:

চলতি বছরের ভয়াবহসব দুর্যোগ অভন্ত্যরীণ অভিবাসনে চাপ বাড়াবে

ইবনু ফিকরি ইন্দোনেশিয়ান সম্প্রদায়গুলিতে তার ফিল্ডওয়ার্কেও এই ছাপ অর্জন করেছিলেন। তিনি এটিকে ‘সাংস্কৃতিক পরিবেশগত সচেতনতা’ হিসাবে বর্ণনা করেছেন। যা ধর্ম, ঐতিহ্য এবং স্থানীয় অনুশীলনের একটি ইন্টারপ্লে, যা মানুষকে পরিবেশ রক্ষা করতে উৎসাহিত করে।

সূত্র:ডয়েচেভেলে। নিবন্ধটি ভাষান্তর করেছেন অভিবাসী ডটকম এর রাজশাহী প্রতিনিধি রীতা জান্নাত

Get in Touch

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Related Articles

অভিবাসীর সঙ্গে থাকুন

10,504FansLike
2FollowersFollow
28SubscribersSubscribe

সাম্প্রতিক ঘটনা